Bangladeshi Movie Review

অদম্য এক মানিকের গল্প ‘পাঠশালা’

বেশ কয়টা দিন ধরে বর্তমান সময়ের বাচ্চাদের নিয়ে আমি বেশ চিন্তিতই ছিলাম। কারণ, আমাদের সময় আমাদের যে বিনোদনের মাধ্যমগুলো ছিল এখন তার কিছুই নেই। আমাদের মুক্তভাবে চিন্তা করতে শেখানোর জন্য ঘরের বাইরে ছিল খোলা মাঠ, পাঠশালা আর ঘরের ভেতরে টেলিভিশনে ছিল সুস্থ বিনোদন। আর এখন বাচ্চাদের বিনোদন মানেই বেশ কিছু ইলজিকাল কার্টুন আর মোবাইল গেমস। ফলাফল স্বরূপ, বর্তমান সময়ের বাচ্চাদের মুক্তভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে বিপদজনকভাবে।

কয়দিন আগে ‘পাঠশালা’ সিনেমার ট্রেইলার দেখে আশা করেছিলাম, এই মুভির হাতধরে বাচ্চাদের বিনোদন মাধ্যমের অপর্যাপ্ততা কমবে একটু হলেও। আর মুভিটা দেখেতো মনে হল, এটা শুধু বাচ্চাদের সুস্থ বিনোদনেরই খোরাক পূরণ করবেনা, বড়দেরও ভালোভাবে বিনোদিত করবে। আমি সাধুবাদ জানাই পরিচালকদ্বয় আসিফ ইসলাম আর ফয়সাল রদ্দিকে, যাদের জন্য ঘরের ছোট বাচ্চাদের সাথে নিয়ে দেখার মতো একটা মুভি পেয়েছি।







‘পাঠশালা’ মূলত মানিক নামের এক স্বপ্নবাজ ছেলের গল্প। নিম্নবিত্ত জীবনটা যাপন করার জন্য এবং মাকে চিকিৎসা করানোর জন্য ছোট্ট মানিককে তার প্রিয় স্কুল ছেড়ে আসতে হয় শহরে, একা! বিশাল এই শহরে সে কাজ নেয় একটা গ্যারেজে। শহরে তার একাকীত্বের সঙ্গী তার স্কুলে পড়ার স্বপ্ন। এখানে আমরা খুঁজে পাই এই শহরের লাখ লাখ পথশিশুকে, যারা বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে, তবে আসলে সত্যিকারের ‘বাঁচা’টাই তারা ভুলে যায়।

মানিকের স্বপ্ন সে কাজ করে পড়াশোনা করবে, মাকেও ঢাকা এনে ভালো ডাক্তার দেখাবে। কিন্তু ছোট্ট এই মানিক জানে না, জীবনটা আসলে কত কঠিন। তার কঠিন জীবনটা একটু সহজ করার জন্য হলেও আসে চুমকি নামের মিষ্টি একটি বাচ্চা মেয়ে। তবুও জীবনের প্রয়োজনে তার সামনে চলে আসে অনেকগুলো রাস্তা, যেখানে পথিকেরা হেঁটে বেড়ায় আসলে কোন ব্যক্তির উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই। এমন একটি রাস্তার নাম কালু, যার কাছে জীবন মানে শর্টকাট। কালু মানিককে আহ্বান করে এই শর্টকাটে চলে আসার জন্য।

খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মুভির এই অংশটাও আসলে বাস্তব জীবনেরই একটা অংশের প্রতিচ্ছবি। জীবনে চলার পথে আমাদের সামনে এমন ‘শর্টকাট’ অনেক চলে আসবে, সবাই পারে না ‘শর্টকাট’ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর লোভ সামলাতে। এর পরিণতি সবসময় সুখের হয় না। মানিকের কাছ থেকে আমরা ন্যায়ের পথে চলা শিখতে পারি। এরপর মানিক কীভাবে স্বপ্নপূরণের পথে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে, মাকে ঢাকায় আনতে পারবে নাকি পারবে না, সে কী আবারো স্কুলে যেতে পারবে নাকি পারবে না- এই প্রশ্নগুলোর সাথেই মুভি সামনে এগোতে থাকে।




‘পাঠশালা’ মুভির সবচেয়ে বড় পাওয়া হল মানিক। একদম ন্যাচারাল অভিনয় করেছে ছেলেটা। ফেলে আসা স্কুলের জন্য বেদনা, মায়ের কোলে ঘুমানোর আকাঙ্ক্ষা আর আবারো স্কুলে পড়তে না পেরে নীরব আর্তনাদ- প্রতিটা মুহূর্ত হাবিব অর্থাৎ মানিক ফুটিয়ে তুলেছে একদম পরিপূর্ণভাবে। মানিক ছাড়াও কালু চরিত্রে নাজমুল হোসেন খুব ভালো করেছে। চুমকি চরিত্রে ইমা আক্তার কথা চেষ্টা করেছে বারংবার তবে তার অভিনয় অনভিজ্ঞতা মাঝে মাঝে দৃষ্টিকটু লেগেছে। কিন্তু যতোটুকু সে করেছে, মুগ্ধতা ছড়িয়েছে তার কিউটনেস দিয়ে।




মুভির গল্প যে খুব বেশি আহামরি তা না, তবে অনেকদিন পর এমন একটি শিশুতোষ মুভি নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে। তাছাড়া সিনেম্যাটোগ্রাফি, বিজিএম, স্ক্রিনপ্লে, ডায়লগ- সব ছিল আপ টু দ্যা মার্ক। তবে প্রথম দিকে কিছু শট খুব বেশি ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল যা অনেকের বিরক্তির কারণ হতে পারে। আবার কিছু ক্যামেরা শটই এই মুভির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। কিছু লং শট খুব সুন্দর হয়েছে, সেট ডিজাইনও ইম্প্রেসিভ ছিল। মুভিতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়ের একটা হল ডায়লগগুলো, অনেকগুলো সুন্দর ডায়লগের একটি হল, ‘শিখনের ইচ্ছা থাকলে পুরা দুনিয়াডাই একটা ইস্কুল!’

তাছাড়া মুভির ম্যাসেজটাও খুব সুন্দর আর দরকারি। এই মুভিটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে জীবনের কিছু কঠিন বাস্তবতা আর বিপদে ধৈর্য ধরার সুফল।




‘পাঠশালা’ একটি পরিপূর্ণ শিশুতোষ মুভি। আপনার ঘরের ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে যান ‘পাঠশালা’ দেখতে যেন তারা বুঝতে পারে মানিকের মতো মানুষদের কষ্ট, যেন তারা পরিণত বয়সে দাঁড়াতে পারে এই মানিকদের পাশে! আমি মনে করি, এমন মুভি আসলে এতো বছর পর পর না হয়ে প্রতি বছর হওয়া উচিৎ। আর সেক্ষেত্রে আমরা দর্শকরাই হতে পারবো পথ প্রদর্শক।

তাছাড়া এই মুভির আয়ের একটা অংশ যাবে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য। সব মিলিয়ে ‘পাঠশালা’ দেখাটা আসলে আমাদের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ‘পাঠশালা’র মতো একটা মুভি যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে এর দায়ভার কিন্তু মুভি সংশ্লিষ্টদের না, এই ব্যর্থতার দায়ভার নিতে হবে আমাদেরই!

You may also like...

Leave a Reply