Bangladeshi TV Show Review

ছোট্ট পাখির বাসায় সবার নিমন্ত্রণ!

জীবনের গল্পগুলি অনেকটা ময়লা পড়ে ঘোলা হয়ে যাওয়া থাই গ্লাসের বাসার মতো। বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে এই গল্প দেখলে নিজের জীবনেরই একটা প্রতিবিম্ব দেখা যায় তবে ভিতরে কী হচ্ছে সেটা বাইরে থেকে দেখা সম্ভব না কোনভাবেই। পলেস্তারা উঠা বিবর্ণ দেয়াল, ঘরের কোণায় লুকিয়ে থাকা টিকটিকি আর বারান্দায় টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সস্তা সোডিয়াম লাইটটাই জানে সে বাসায় থাকা মানুষগুলোর গল্প।

রুটিনে আটকানো জীবনটা যাপন করতে করতে যখন ধূসর হয়ে যায়, তখনই এই জীবনের গল্পটা মোড় নেয় অসীম শূন্যতার দিকে। একটু ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে, নির্দিষ্ট সীমায় আঁটকে থাকা মানুষের চেয়ে অসীম শূন্যতায় হেঁটে চলা মানুষের সংখ্যাই কিন্তু বেশি। আর সেই মানুষগুলোর জীবনের গল্প নিয়েই তরুণ নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ নির্মাণ করেছেন মন ছুঁয়ে যাওয়া একটি নাটক- ‘ছোট্ট পাখির বাসা’, যে বাসায় তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সুখী ভুবনের সবাইকে।







পাখি (মেহজাবিন) নামের একটি মেয়েকে বিয়ে করে আনে বাবু (অপূর্ব)। বাবু তার মনের থেকে গভীরভাবে ভালোবাসে পাখিকে, কিন্তু পাখির সামনে কোন অদৃশ্য দেয়ালের জন্য তার কাছে যেতে পারে না। পাখি নিজেও পারে না এই দেয়ালটার জন্য তার স্বামী বাবুকে কাছে টানতে। এভাবে প্রথমেই বিষাদ দিয়ে শুরু হয় একটি বিষাদকাব্যের। সময়ের আবর্তে দেখা যায় পাখির সামনের এই দেয়ালের কারণ কিছু মানুষ নামের পশু যাদের বিচরণ আমাদের সমাজের পরতে পরতে। তবে সবকিছু জেনেই পাখিকে গ্রহণ করার ফলে বাবুকে ছাড়তে হয় অনেক কিছু। একটা সময় মনে হবে এটা বাবুর ত্যাগের গল্প। জীবন থেমে থাকে না, এগিয়ে যায় তার আপন গতিতে। এই গতির সাথে তাল মেলাতে মেলাতে একসময় স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে পাখি। তার ছোট্ট বাসা পূর্ণ করে ভালোবাসা দিয়ে। এই সময় মনে হয় এটা একটা আদর্শ স্ত্রীর গল্প, যে স্ত্রী ভালোবাসা দিয়ে দূরে ঠেলে দেয় সব দুঃখকে। কিন্তু তারপর হঠাৎ একদিন হঠাৎ এক ঝড়ে ভেঙে যায় ছোট্ট পাখির ছোট্ট বাসা।




নাটকের গল্প নিয়ে কিছু বলবো না কারণ, এমন গল্পের বুনন অনেক আগের থেকেই হচ্ছে এবং হবেও। কারণ, এটা জীবনের গল্পই। সময় তার নিয়ম ধরে এগিয়ে যায়, তারপরেও জীবনের এমন গল্পগুলো সবসময় সজীব থাকে। মোটামুটি একই গল্পের অন্য নাটক থেকে‘ছোট্ট পাখির বাসা’র প্রধান পার্থক্য হচ্ছে এই নাটক জুড়ে একটা হাহাকারের আবহ তৈরি করা হয়েছে। স্ক্রিনে অভিনয় করতে থাকা মানুষ দুইটি হয়তো শব্দ করে কেঁদেছে কিন্তু স্ক্রিনের বাইরে থাকা দর্শকরা কাঁদবে শব্দহীন কান্না। নাটকটি দেখতে দেখতে অপার্থিব এক হাহাকার আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে, যেই বোধ থেকে সহসাই বের হওয়া সম্ভব না। প্রাচীন আর শাশ্বত এই আবেগের স্বাদটা অনেকদিন পর পাইয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ‘ছোট্ট পাখির বাসা’র নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ সহ টিমের সবাইকে। তবে আমার অনুরোধ থাকবে নির্মাতার কাছে, তিনি যেন নতুন গল্পের শৈল্পিক নির্মাণের একটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

পুরো নাটকে অভিনয় শিল্পী হিসেবে শুধু অপূর্ব আর মেহজাবিনই ছিল। একটা ছোট্ট বাসায় কেটেছে নাটকের পুরোটা সময়। একই অভিনেতাদের একই বাসায় দেখে দেখে বিরক্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই পুরোটা সময় মোহাবিষ্ট হয়ে ছিলাম শুধুমাত্র অপূর্ব-মেহজাবিনের অভিনয়ের জন্য, তাদের তৈরি করা ঘোরের জন্য।

নাটকটি ভালো লাগার আরেকটি কারণ হচ্ছে এই নাটকে পাখিরুপী মেহজাবিনকে দিয়ে আমাদের সমাজে ধর্ষিত মেয়েদের প্রতি সাধারণ মানুষের নিম্ন দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এবং অপূর্বকে দিয়ে দেখানো হয়েছে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়, কেউ কেউ সত্যিই ভালো মনের মানুষ! সোশ্যাল এওয়ারনেস রেইজিং এই সোশ্যাল ম্যাসেজটা ভালো ছিল।

স্পয়লার! 

কেউ কেউ যখন কাউকে খুব বেশি ভালোবাসে তখন তার জন্য মনের কোণে খুব গোপনে ছোট্ট একটা বাসা বানায় ভালোবাসার মানুষের জন্য। মানুষটা থাকুক বা না থাকুক, তার জন্য এই বাসার বারান্দায় মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, মাঝে মাঝে তীব্র জোছনা হয়, বারান্দা থেকে পাখির উড়াউড়ি দেখা যায় অবিরাম। পাখি মারা যাওয়ার পর তার পরনের শাড়ি ধরে বাবুর কান্না যেন নীরবে জানিয়ে যাচ্ছিলো, পাখির ছোট্ট বাসায় পাখির নামে নতুন ভোর শুরু হবে প্রতিদিন, হাহাকারের পরিমাণটা এখানে তীব্র ভাবে বুকে লাগে!




নাটক দেখার পর অপূর্ব নিজেই তার অনুভূতি জানিয়েছিলেন। অপূর্বর অনুভূতির লৈখিক প্রকাশ করেই আমার লেখা শেষ করছি। জিয়াউল ফারুক অপূর্ব বলেছিলেন, ‘এই নাটকটি দেখার পর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষন কোন কথা বলিনি। না আমি আর না অদিতি। কেন বলিনি সেটা ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক কিছু লিখতে হবে। নিজের করা কাজের রিভিউ লিখতে চাইনা, শুধু বলতে চাই নাটকটি দেখার পর বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা হাহাকার জন্ম নিয়েছিল। যে হাহাকারটা ছেড়ে যেতে সময় নিচ্ছিল অনেক। মাবরুর রশীদ বান্নাহ তোমাকে একটাই কথা বলব “This is you I used to know! This is you. I am so proud of u my brother! ” মেহজাবিন, তুমি সত্যিই অসাধারণ অভিনয় করেছো৷’

নাটকটি দেখুন, নিচের লিংক থেকে:

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *