Contents English Movie Review

“ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম” (২০১৯)- আ পিউর ‘জোয়া-দে ভিভ্রে’ !

Dolemite Is My Name (2019)

– কমেডি, বায়োগ্রাফি, ড্রামা

 

– চলচ্চিত্রের শৈল্পিক দিক এবং নান্দনিকতার দিক- একটিও সম্বন্ধে কোনপ্রকার ধারণা না রাখা কিংবা এ জগতের সাথে কোনপ্রকার সম্পৃক্ততা না রাখা বা কষ্মিনকালে ‘চলচ্চিত্র’ নিয়ে দু’টো মিনিট ভাবার অবকাশ না রাখা কোন লোকের হঠাৎ, খেয়াল হলো তাই চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলাম- এই বিষয়টি অনেকটা ‘গরীবের ঘোড়া রোগ’ হওয়ার মতোই। আর এমন লোকের/লোকজনের জীবনের সেই নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো (যে-সিনেমাগুলোয় মূলত “জোয়া-দি ভিভ্রে” বিষয়টিই মুখ্য) বর্তমানে একটা ‘সাব-জনরা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে/হতে যাচ্ছে। সেই “এড উড” (১৯৯৪) হতে শুরু করে “ব্যাডঅ্যাসেস” (২০০৩), “দ্যা ডিজাস্টার আর্টিস্ট” (২০১৭) এর পর এই তালিকা আরেকটু দীর্ঘায়িত হলো “ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম” দিয়ে। এবং “এড উড” (১৯৯৪) দিয়ে এই ‘শ্লেষপূর্ণ বায়োপিক’ সাবজনরা প্রতিষ্ঠিত করা চিত্রনাট্যকারদ্বয় ‘স্কট আলেক্সান্ডার’ ও ‘ল্যারি করাসজিউস্কি’-ই এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন।

 

“ডোলেমাইট” ৭০ দশকের ‘ব্ল্যাক্সোপ্লোটেশন’ সাবজনরার পরিচিত এক সিনেমা। র‍্যাপ সিঙ্গার ‘রুডি রে মুর’ এই “ডোলেমাইট” চরিত্রটি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’, সিনেমা ৭০ দশকে রুডি মুরের হতাশাপূর্ণ অবস্থার সময়কাল থেকে গল্প বর্ণনা শুরু করে। মধ্যবয়সী রুডি মুর তখন লস এঞ্জেলসের একটি রেকর্ড স্টোরের ম্যানেজার। তার গানের ক্যারিয়ার পুরোপুরিই বিপর্যস্ত (যা মূলত তার হতাশা আর আক্ষেপের প্রধান কারণ)। এমনকি তাঁর নিজের রেকর্ড স্টোরও তাঁর গান চালাতে নারাজ। মাথার ভেতরে বিক্ষিপ্ত চিন্তার বোঝা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে রুডি সম্বলহীন এক মানুষের সংস্পর্শে আসে। সেই মানুষটিই তাকে দালাল ‘ডোলেমাইট’ এর গল্প বলে। ‘ডোলেমাইট’ এর গল্পে অভিভূত হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবিতে সে ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রটিকে দেখতে পায় রুডি মুর। ভাঁজ করা গোলাপি শার্টের বোতাম এঁটে, আফ্রো ফর্মড উইগ মাথায় পড়ে, সাদা স্যুট গায়ে জড়িয়ে, হাতে একটা ছড়ি নিতে নিতে ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রের আউটলুকও সেদিন রুডি মুর ঠিক করে ফেলে। ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ বলে শুরু করা তাঁর অশিষ্ট, ‘অ্যাস-কিকিং’ স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, ক্লাবগুলোতে খুব সাড়া ফেলে। সেসব আবার রেকর্ড করে বিপণনের ব্যবস্থাও করা শুরু করে রুডি মুর।

স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করার মুহূর্তে রুডি রে মুর।

আন্ডারগ্রাউন্ডে ‘ডোলেমাইট’ তখন বহুল আলোচিত এক নাম। তবে রুডি মুরের মাথায় সিনেমা নির্মাণের ভূত সাওয়ার হয় নি তখনো। প্রথম কমেডি অ্যালবামের বিরাট সফলতা উদযাপন করতে রুডি আর তাঁর বন্ধুবান্ধব মিলে তখন শহরে বেশ নামডাক করা সিনেমা ” দ্যা ফ্রন্ট পেইজ ” দেখতে যায়। সবাই বলাবলি করছে, ‘হাস্যরসে ভরা জব্বর একখান ফিল্ম হয়েছে’। কিন্তু রুডি আর তাঁর বন্ধুরা সিনেমা দেখতে গিয়ে বুঝতে পারলো না, এই সিনেমায় শ্বেতাঙ্গ দর্শকগুলো এতো হাসির খোরাক পেল কোথায় (?)। হল থেকে বের হয়ে সিনেমা সম্পর্কে রুডি ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রের মতো দু’ চার’টা অশিষ্ট সংলাপ ঝেড়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিল, সে তাঁর লোকজনদের জন্য (কৃষ্ণাঙ্গ) সিনেমা বানাবে। তাঁর মতে; যৌনতা, হাস্যরস আর কুংফু ছাড়া আবার সিনেমা হয় নাকি ? এসব উপাদান রেখেই সে-সিনেমা বানাবে এবং ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রকে এবার পর্দার হিরো বানাবে। সিনেমার গল্পও ভেবে ফেলেছে এবং নায়ক ও বনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রুডি মুর। আর ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ সিনেমার পরবর্তী গল্প ‘ডোলেমাইট’ (১৯৭৫) সিনেমা’টি নির্মাণের পেছনের হাসিঠাট্টায় ভরপুর ঘটনাবলি এবং নির্মাণের পর সিনেমা মুক্তি দেওয়া নিয়ে নানা জটিলতার আখ্যান (সেখানেও খুব সহজাতভাবে মিশে রয়েছে হাসির খোরাক)।

 

প্রারম্ভিক দৃশ্যে ‘মারভিন গ্যায়’-এর “লেট’স গেট ইট অন” গানের প্রথম কয়েকটি নোটের নির্ভুল ব্যবহার করে ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ নিবদ্ধতার সহিত তাঁর সময়, স্থান এবং আবহ প্রতিষ্ঠা করেছে। এবং প্রারম্ভিক দৃশ্যের মতো সেই ‘অবিচলতায়’ খামতি অনুভূত হওয়ার কোন সুযোগ তৈরি হয় নি বাকি সিনেমায়-ও। কস্টিউম ডিজাইন হতে শুরু করে সেট ডিজাইন, আবহসঙ্গীত নির্বাচন, অভিনেতা/অভিনেত্রীদের অভিনয় সবকিছুতেই রুডি রে মুরের ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রটির উত্থানের সেই দশক (৭০ দশক) এবং সেই দশকের সাংস্কৃতিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার চিত্র পুনরায় সৃষ্টি করা হয়েছে, যথেষ্ট দক্ষতা আর ভালোবাসা দিয়ে। অত্যন্ত সৃজনী প্রক্রিয়ায় রুডি মুর এবং তাঁর ডোলেমাইটের দুনিয়া পুনরায় সৃষ্টি করা হয়েছে সিনেমায়, যে-প্রক্রিয়ায় রুডি রে মুর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রটিকে আলিঙ্গন করেছে।

‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ সে-অর্থে বায়োপিক সিনেমা না। বায়োপিকের ধরাবাঁধা ছক এখানে চোখে পড়ে না। রুডি রে মুরের কর্মজীবনের বাইরের বিবরণ সূক্ষ্ম এবং সংক্ষিপ্ত আকারে সিনেমায় রাখা হয়েছে। তেমন’টি না হলে, তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াতো, যে-গল্প এই সিনেমা বয়ান করছে, সে-গল্পের প্রেক্ষিতে। বায়োপিকের ছককাটা নিয়মগুলো না মেনেও, ‘নিয়ম’ মেনে চলা অনেক সিনেমার চেয়ে মূল বিষয়ের প্রতি বেশি অনুগত থেকেছে ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’।







রুডি এন্ড ফ্রেন্ডস

‘ডোলেমাইট’ চরিত্রটি যদি রুডি মুরের ক্যারিয়ারের রিস্টার্ট বাটন হয়, তবে ‘রুডি মুর’ চরিত্রটি অভিনেতা ‘এডি মর্ফি’র রিস্টার্ট বাটন। আশির দশকে “বিভারলি হিলস কপ”, “৪৮ আওয়ারস” এর মতো সিনেমা উপহার দেওয়া মর্ফি মাঝের সময়টা যেন খেই হারিয়ে তালবেতালে পার করেছেন। এই সিনেমার চিত্রনাট্যকারদ্বয় (আলেক্সান্ডার এবং করাসজিউস্কি) গেল দুই দশকের মাঝে শ্রেষ্ঠ উপাদান সম্বলিত একটি চরিত্র দিয়েছেন মর্ফিকে। ‘আয়রনিক বায়োপিক’ সাবজনরা সৃষ্টি করা “এড উড” সিনেমায় এই চিত্রনাট্যকারদ্বয় আমেরিকান ‘গো-গেট-ইজম’ স্বভাবের সাথে মিডিওক্রিটি তুলে এনেছিলেন। তবে ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ সিনেমায় ‘শ্লেষ’কেই কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ‘কাল্ট’ উপাধি পাওয়া ‘ডোলেমাইট’ এর নির্মাণকালের পূর্ণ বিবরণ চিত্রনাট্যে রাখার পাশাপাশি সে-সিনেমার পরিচালক জোনস এর সিনেমাটি নিয়ে সিরিয়াস মনোভাব অন্যদিকে রুডি মুরের হাস্যরস আর পাগলামিতে ভরা ক্যামেরার পেছনের ঘটনাবলি নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে। জোন্স সুযোগ পেলেই সিনেমায় (ডোলেমাইট) বর্ণবৈষম্য সংক্রান্ত রাজনৈতিক বক্তব্য রেখে সিনেমাকে ভারী করে তোলার চেষ্টা করতো। অন্যদিকে রুডি মুর নিগূঢ়তম বক্তব্যকে তার স্বভাবসুলভ কমনীয়তার সাথে অঙ্গীভূত করে হালকাচালের বিনোদনকে কেন্দ্রে আনা আর তাঁর লোকজনকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার কাজটি করতো। নিজেকেই নিজের ‘কিংবদন্তী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলতো রুডি মুর। এবং তা এই বুটস্ট্র‍্যাপ কমেডির আবহকে আরো ব্যাপ্তিশীল করে তুলেছে।

 

এডি মর্ফির অভিনয় এই ‘রুডি রে মুর’ চরিত্রটিকে সাক্ষাৎ জীবন্ত করে তুলেছে। মনে হয় যেন, রুডি মুরের সৃষ্ট ‘ডোলেমাইট’ চরিত্রের মতোই, আরেকটি সৃষ্ট চরিত্র এডি মর্ফি কিংবা মর্ফির আরেকটি চরিত্র এই ডোলেমাইট ওরফে রুডি মুর। মুর, ডোলেমাইট চরিত্রটিই শুধু আবিষ্কার করেন নি, চরিত্রটিকে মানুষজনের কাছাকাছি নেওয়ার উপায়, অর্থ আবিষ্কার করেছেন এবং মুরের সেই দিকটি পুরোপুরি ধারণ করে, এডি মর্ফি চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত এবং নিজেকে এই চরিত্র রূপায়নের জন্য ‘অদ্বিতীয়’ একজন করে তুলেছেন। এবং সহচরিত্রগুলোতে একঝাঁক দক্ষ অভিনেতা/অভিনেত্রীর সহযোগীতাও মর্ফি পেয়েছেন। ধীরগতির চলন বলন আর বাঁকা বাঁকা কথা বলা স্বভাবের ডি’উরভিল মার্টিন চরিত্রে ‘ওয়েসলি স্নাইপস’ নিখুঁত অভিনয় করেছেন। মুরকে পরাস্তকারীর ভূমিকায় যথাযথভাবেই তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। এবং লেডি রিড চরিত্রে দা’ভিনে জয় র‍্যান্ডল্ফ সম্মোহনী অভিনয় করেছেন। ‘ডোলেমাইট’ সিনেমার প্রিমিয়ারের আগে লেডি রিড যখন রুডি রে’কে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুরে বলে উঠে, ” তুমি আমার জন্য যা-করেছো, তাতে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। কারণ আমার মতো এমন দেখতে কাউকে ওই বড় পর্দায় কখনো আমি দেখি নি “, এই দৃশ্যটি গোটা সিনেমায় ‘দুষ্প্রাপ্য’ একটি দৃশ্য হিসেবে ধরা দেয়। এই সিনেমার অন্যান্য সংবেদনশীল ও আবেগপূর্ণ দৃশ্যগুলো হৃদয়ে অনুনাদ জাগালেও এই দৃশ্যটি সর্বাপেক্ষা ‘অর্জিত’ এবং বলাই বাহুল্য দা’ভিনে র‍্যান্ডল্ফ দৃশ্যটিকে একেবারে নিজের করে নিয়েছেন। (পরিচালক ‘ক্রেইগ ব্রিউয়ার’ হতাশার সুর টেনে দৃশ্যটিকে আজকের প্রেক্ষাপটেও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক করে তোলেন।)




রুডি এবং লেডি রিড এর সেই অনুনাদি দৃশ্যটি।

‘ক্রেইগ ব্রিউয়ার’ বরাবরের মতো ৭০ দশকের প্রতি তাঁর উন্মাদনা এবং প্রথাভঙ্গকারী চরিত্রদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আগ্রহকে আবারো অক্ষুণ্ণ রাখলেন এই সিনেমা দিয়ে। রাজনৈতিক এবং সামাজিক গভীর বিষয়াদি নিয়ে বক্তব্য থাকলেও “ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম” কখোনোই অতীব গূঢ় এবং গভীর হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করে নি। সংলাপে “এড উড” সিনেমার সেই প্রফুল্ল আমেজটাকে রেখেছেন আলেক্সান্ডার এবং করাসজিউস্কি। সাথে ‘জন ওয়াটারস’-এর সিনেমার ‘অদ্ভুত বনাম স্বাভাবিক’-এর লড়াইয়ের সেই ভাবের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। স্প্ল্যাশি এডিটিং এবং কৌতুকবোধে ভরা সংলাপ সিনেমার যে টোন সৃষ্টি করেছে, তাই-ই ব্যক্তি রুডি রে মুর কে ছিল- সেই দিকটিকে প্রতিফলিত করে। সেই ব্যক্তি রুডি রে মুরের মতোই ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ কখনো বেপরোয়া কিন্তু সবসময় ভালো-মনোভাবপূর্ণ, অপূর্ণতা মেনে নিয়ে গর্বিত এবং সীমাহীন উল্লাসে মুখর।

(নিজের গল্প নিজের মতো করে বলতে দিলে, বাস্তবায়িত করতে দিলে জাদুকরী কিছু ঘটিয়ে দেখানোর ক্ষমতা রাখে যে-কেউই, যার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে ‘ডোলেমাইট’ এবং ‘ডোলেমাইট ইজ মাই নেইম’ দুটোই।)

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *