Bangladeshi TV Show Featured Reviews TV Show Uncategorized

যেখানে অনুভূতির আশ্রয়, সেখানে মহাপ্রলয়!

এক এতিম দম্পতি, যারা সারাটা জীবন হেঁটেছে অচেনা এক গন্তব্যে। তাদের আশপাশের সবাই যখন তাদের ছোট্ট আঙুলের ভাঁজে খুঁজে পেয়েছিল নির্ভরতা, সেখানে তাদের আঙুলের ভাঁজে খেলা করেছে শুন্যতা। তাদের জানালার গরাদে লেগে থাকতো একরাশ বিষাদ। প্রতিদিন শুরু হতো অদ্ভুত এক শুন্যতায়, যে শুন্যতা দূর করার মতো কেউ ছিল না। এই শুন্যতা হচ্ছে বাবা-মায়ের শুন্যতা, একটি নির্ভরতার আশ্রয়ের শুন্যতা। এ যেন সমুদ্রের অতল, ডুবে যেতে হয় না চাইলেও। ছোট থেকে প্রচন্ড কষ্ট বুকে ধারণ করে বড় হওয়া দুইটা এতিম এক হয়ে সংসার শুরু করলো। সংসারে সব আছে, নেই শুধু পূর্ণতা।

গল্পে আছে আরও এক দম্পতি, যারা আলাদা হয়ে আছে ১৩ বছর ধরে। যাদের দেখা নেই ১৩ বছর ধরে। দুইজন আছে দুই আশ্রমে, কেউ জানেও না কে কোন আশ্রমে আছে। এই দম্পতি তাদের সন্তানদের জন্য তৈরি করেছিল সুখের একটি নীড়, জোছনাবিলাসের আশ্রয়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, তাদের বানানো আশ্রয়ে আশ্রয় পেলো না তারা নিজেরাই! এমনকি আলাদা হয়ে যেতে হয়েছে তাদেরকেই! যে সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের এত ত্যাগ-তীতিক্ষা, সেই সন্তানদের কাছেই তারা বোঝা। তাই তীব্র এক কষ্ট বুকে নিয়ে তাদের দিনগুলি যাপিত হচ্ছিল নীরবে-নিভৃতে।

দুইরকম কষ্ট বুকে ধারণ করা এই দুই দম্পতি এক সময় এক হয় ছোট্ট একটি মেয়ের কারণে। কিন্তু কোনো ঝড় এসে তাদের জীবনের নতুন আশ্রয়টা আবার তছনছ করে দিবে না তো?

এমনই এক অসাধারণ গল্প নিয়ে তরুণ নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ এই ঈদে নির্মাণ করেছেন চমৎকার এক নাটক, যার নাম ‘আশ্রয়’। সেই চিরচেনা ছন্দে না গিয়ে এবার নির্মাতা হেঁটেছেন অন্য এক পথে, সুন্দর এবং সময়পযোগী এক গল্প সাথে নিয়ে। একঘেয়ামি রোগে আক্রান্ত দর্শকরা এখন যে ধরনের গল্প খুঁজেন, ‘আশ্রয়’ ঠিক সেরকম গল্প। এই গল্পে গভীরতা আছে, ছন্দ আছে, আবেগ আছে, আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুজন মানুষ বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয়তার কথা। যে সময় শহরে শহরে বৃদ্ধাশ্রম বেড়ে যাচ্ছে, বৃদ্ধাশ্রমে দুঃখী মানুষগুলোর সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে, একটা বয়সের পর বাবা-মা’র ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে হয় কবে তাদের সন্তান তাদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে, সেই সময় এই গল্পটা খুব বেশিই দরকার ছিল। ‘আশ্রয়’ নাটকে নেই কোনো অতিনাটকীয় ব্যাপার, নেই কোনো কমেডির নামে সস্তা ভাঁড়ামো, আছে পরিচ্ছন্ন একটি গল্প। আর আছে নির্মাতার একটি ম্যাসেজ, যে ম্যাসেজটি বর্তমানে প্রতিটা পরিবারে খুব বেশি দরকার।







‘আশ্রয়’ নাটকে বাবা-মা হীন দম্পতির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তাহসান-তিশা, আর বৃদ্ধ দম্পতির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম-মম। প্রত্যেকেই চেষ্টা করেছেন প্রত্যেকের জায়গা থেকে সেরাটা দিতে এবং আমার মনে হয় তারা সফল। কিউট লেগেছে বাচ্চা মেয়েটিকে তবে মাঝে মাঝে ডিস্ট্র্যাক্টেড হয়ে যাচ্ছিল মনে হল। সাইড ক্যারেক্টারগুলো থেকেও পরিচালক ভালো অভিনয় বের করে এনেছেন। ডায়লগ ছিল পরিশীলিত, আবেগ ছিল পরিমিত। বেশ শ্রুতিমধুর গানও ছিল। আমার কাছে বৃদ্ধ মোশাররফ করিম আর মমর মেকআপ টা দৃষ্টিকটু লেগেছে, এখানে আরেকটু নজর দেয়ার দরকার ছিল। আর নাটকের ডিউরেশন অনেক বেশি মনে হয়েছে, ১ ঘণ্টা ৬ মিনিটের সাথে আরও ১২-১৫ মিনিট যোগ করলে এখন ১টা মুভিও হয়ে যায়!

সব মিলিয়ে আমি বলবো ‘আশ্রয়’ শুধু নির্মাতার নয়, এই ঈদে নির্মিত সেরা নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। যারা পরিবার নিয়ে একটি সুন্দর সময় কাটাতে চান, তাদের কাছে বেষ্ট চয়েজ হতে পারে ‘আশ্রয়’। তাছাড়া একটি ভালো নির্মাণ সফল করার দায়িত্ব শুধু নির্মাণ সংশ্লিষ্ট মানুষদের নয়, এর দায়িত্ব দর্শকদেরও নিতে হবে। তাহলেই জীবনঘনিষ্ঠ গল্পের নির্মাণ আরও বেশি বেশি হবে!

স্পয়লার অ্যালার্ট!      স্পয়লার অ্যালার্ট!        স্পয়লার অ্যালার্ট!

আমরা সাধারণত সন্তান এডপ্ট করার কথা জানি বা করি কিন্তু কখনো কোনো নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে বাবা/মা হিসেবে এডপ্ট করার কথা চিন্তা করেছি? মনে হয় না! ‘আশ্রয়’ নাটক মূলত বাবা-মা এডপ্ট করার এই থীমের উপর বেজ করেই বানানো। পৃথিবীর সব সন্তানদের উপর থেকে বিশ্বাস হারানো কোনো বাবা/মায়ের মনে সেই হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা যাবে, তাদেরকেও আশ্রয় দেয়া যাবে- এই চিন্তাটাই আমার মনে ঝড় বইয়ে দিয়েছে, অনুভূতি উলট-পালট হয়ে গিয়েছে! আমি নাটক শেষ করে অনেকক্ষণ ভেবেছি ব্যাপারটা নিয়ে। যদি সত্যিই বাবা-মা এডপ্ট করা যেতো, তাহলে আর কোনো বৃদ্ধাশ্রমের বাতাসে হাহাকার উড়ে বেড়াতো না, ক্লান্ত দুপুরে কোনো সন্তানহীন বাবার মনে অব্যক্ত বিষাদ জমাট বাঁধত না!

 

‘আশ্রয়’ দেখুন এখানে ক্লিক করে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *