Bangladeshi Featured Reviews Movie Review

উপন্যাসে দেবী ও সিনেমায় দেবী!

এখন সিনেমা পাড়ায় সব থেকে হাইপড নাম “দেবী- মিসির আলি প্রথমবার”। স্বাভাবিক ব্যাপার। হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি পড়ে কিশোর পার করা জেনারেশনের কাছে হুমায়ূন আহমেদ একটি ভালবাসার নাম। আর সেখানে মিসির আলি নামটা যে দর্শক মহলকে ভালোভাবে নাড়িয়ে দিবে এটাও খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। একটা সময় যে মানুষ গুলোর রোদেলা দুপুর কিংবা নিশিরাত কেটেছে মিসির আলির ধোঁয়াশা রহস্য ঘেরা জগতে সে মানুষ গুলো তো চাইবেই চলন্ত মিসির আলিকে এক পলক বড় স্ক্রিনে দেখতে। যারা হুমায়ূন প্রেমী বা বিশেষ করে মিসির আলি ভক্ত তাদের ভেতর এমন মানুষ হয়তো খুব কম পাওয়া যাবে যাদের মনে হয়নি যে “ইশ, মিসির আলিকে যদি সত্যি সত্যি বাস্তবে দেখতে পারতাম?” হয়তোবা সেই আশাকেই একটা বড় সুযোগ করে দিতে চেয়েছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। নিজের প্রযেজনায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদের “মিসির আলি” কে নিয়ে লিখা “দেবী” উপন্যাসকে সেলুলয়েড সিনেমায় রূপান্তরিত করতে। দেবী উপন্যাস থেকে অভিযোজিত করে বানানো হয়েছে সিনেমা “দেবী- মিসির আলি প্রথমবার” কেমন ছিলো সিনেমাটি?

উপন্যাস দেবী এবং সিনেমা দেবী

এডাপ্ট শব্দটির আক্ষরিক অর্থ অভিযোজন করা, অর্থাৎ খাপ খাইয়ে নেয়া। সিনেমা দেবী ছিলো উপন্যাস দেবী’র এডাপ্টেশন মানে উপন্যাসের উপর নির্ভর করে বইয়ের একটা কাল্পনিক রূপকে চাক্ষুষ রূপ দেয়া। তাই সাধারনত বই থেকে যখন একটা সিনেমা নির্মাণ করা হয় তখন সেই সিনেমা নিয়ে যেমন অনেক আশা তৈরি হয় তেমনি আশার ভঙ্গেরও ব্যাপার থাকে অনেক বেশী। কারন একটা উপন্যাসকে পর্দায় হুবাহু রূপান্তরিত করা কখনই সম্ভব নয়। একটা সিনেমার সময় থাকে খুব হলে ২-৩ ঘন্টা , আর বইতে প্রতিটা চরিত্রকে অনেক বিশদ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় যা একটা সিনেমায় কখনই সম্ভব হয় না। আর পাঠক পাঠিকা বইয়ের প্রতিটা চরিত্র ও দৃশ্য নিজের উপলব্ধি দিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে কল্পনা করে নেয় যা সিনেমাতে সম্ভব হয় না। কারন সিনেমাতে উপলব্ধিটা থাকে একমাত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের। সে ক্ষেত্রে লেখক নিজেই যদি পরিচালক, চিত্রনাট্যকার হয়ে থাকেন সে ক্ষেত্রে অনেকটা আরাম পাওয়া সম্ভব হয় কিছু ক্ষেত্রে তাও অনেক পার্থক্য থেকেই যায়। সিনেমা দেবীতে হয়তোবা শুন্যস্থানটা এখানেই। বাংলাদেশের দর্শক হুমায়ূন আহমেদের লেখা হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্য ও পরিচালনাতেই দেখে অভ্যস্ত। যেমনঃ আগুনের পড়শমনি, শ্রাবন মেঘের দিন, দুইদুয়ারি, ঘেটুপুত্র কমলা সহ আজ রবিবারের মত অনেক নাটক। সিনেমা দেবির পরিচালনায় ছিলেন অনম বিশ্বাস, নিঃসন্দেহে একজন খুবই মেধাবি পরিচালক। দেবী নির্মাণে তাঁর পরিচালনা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে রানু চরিত্রে জয়া আহসান, আনিস চরিত্রে অনিমেষ আইচ, মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরি, নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া ও সাবের চরিত্রে ইরেশ জাকের খুবই ভালো অভিনয় করেছেন । তারপরেও আপনি উপন্যাস দেবীর সাথে সিনেমা দেবীতে হচট খাবেন। কিন্তু একটা আলাদা সিনেমা হিসেবে বাংলাদেশে দেবী-মিসির আলি প্রথমবার কে আপনি অবশ্যই তারিফ করবেন।

সিনেমায় পাওয়া না পাওয়া

উপন্যাস আশির দশকের প্রেক্ষাপটে হলেও সিনেমা বিংশ শতাব্দির প্রেক্ষাপটে নির্মিত। গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গা ছমছম, ভৌতিক, রহস্য ঘেরা ও কি হয় কি হয় একটা ভাব।দৃশ্যায়ন বা থিম নিয়ে চমৎকার ভাবেই সিনেমা এগিয়ে গিয়েছে। সিনেমায় কোনো জোরপূর্বক প্লট ছিলো না । বই থেকে বেশীই ভৌতিক একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিলো সিনেমাতে। রানুর ভয় পাওয়া সাইকোলজিতে দর্শক খুব সহজভাবে ঢুকে যেতে পারবে। রানু কতটা ভয় পাচ্ছে, কতটা স্ট্রেসে আছে তা আমি আপনি খুব সহজেই ধারণা করতে পারবো। এই বিষয়টা সিনেমায় দরকার ছিলো কারন রানুর ভয়কে অনুধাবন করতে না পারলে রানুর প্রতি সিম্প্যাথাসাইজ হওয়া যেত না। তাই সিনেমা থেকে যদি কিছু পেতে চান তাহলে রানুকেই পারফেক্টলি পাবেন। মিসির আলি নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে অনেকেই অনেক হতাশ হয়েছেন বা হবেন। চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলি চরিত্র অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনেকের কাল্পনিক মিসির আলিকেই সে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলে আমার ধারনা যদিও চিত্রনাট্যগত ভাবে কিছুটা ত্রুটি ছিলো বলে আমার মনে হয়েছে। কারন সিনেমায় চঞ্চল চৌধুরি যে মিসির আলিকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি ছিলেন অনেক রসিক ও কৌতুক মানুষ কিন্তু মিসির আলি উপন্যাসে ঠিক এমন নন। তারপরেও চঞ্চল চৌধুরীকে মিসির আলি চরিত্রে আরো বেশীক্ষন রাখা যেত কিন্তু তেমনটি সিনেমায় করা হয়নি। তবে যতোটুকু সময় তিনি ছিলেন যথেষ্ট ভালো করেছেন আর এখানেই চঞ্চল চৌধুরীর সফলতা। নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া ছিলেন অসাধারন। নিশীথিনী যদি আসে এই মেয়ে যে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দিবে তা লিখে দিতে পারি।

রানু ও জয়া আহসান

দেবী দেখে এসে আমি আমার পার্সোনাল ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছিলাম “Jaya Ahsan as Ranu in the Movie is too much Seductive” কথাটা সত্য। আপনি সিনেমায় মুগ্ধ হয়ে যে মানুষটিকে দেখবেন তিনি হচ্ছেন জয়া আহসান। উপন্যাসে রানু একজন ১৮ বছরের বালিকা তাই অনেকেই সিনেমা না দেখেই তাঁর বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের আমি বলবো নিজে কষ্ট করে হলেও একবার সিনেমাটি হলে গিয়ে দেখে আসেন। হয়তোবা সব কিছু বাদ দিয়ে এই রানু চরিত্রে জয়াকে দেখতে হলেও সিনেমাটি বার বার দেখা সম্ভব। কারন সিনেমার পুরোটা সময় আপনি জয়া আহসানের মোহে আবদ্ধ থাকবেন। হুমায়ূন আহমেদের গল্প গুলোতে সবসময় নায়িকারা থাকতেন রূপবতী, আমার মত অনেকেই হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন। মাঝে মাঝে ভাবতাম কেন তিনি এমনটা করতেন? হয়তো আমার মত আপনিও সিনেমাটি দেখলে উত্তর পাবেন। উত্তরটা হচ্ছে সুন্দরের মোহ,সৌন্দর্যের মোহ, সরলতার মোহ কারন মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারি। জয়া রানু চরিত্রে আপনাকে এক মায়ায় জড়িয়ে দিবে ঠিক যেমন হুমায়ূন আহমেদ তাঁর গল্পে কাজটি করতেন। তাই এই সিনেমায় একমাত্র প্রধান প্রাপ্তি জয়া আহসান রানু চরিত্রে বললে ভুল হবেনা।

নীলু ও শবনম ফারিয়া

উপন্যাসে নীলু কোনো সুন্দর বা মিষ্টি মেয়ে নন কিন্তু সিনেমাতে নীলু চরিত্রে এসেছেন শবনম ফারিয়া। খুবই মিষ্টি একটা চেহারার মানুষ। স্বাভাবিক ভাবেই উপন্যাস ভক্তদের কাছে ব্যাপারটা উদ্ভত লাগার কথা। কিন্তু সিনেমা দেখলে আসলে ব্যাপারটা বোধগম্য হবে। নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়াকে নিয়েই আসলে দেবী টিম বড় একটা ক্লু দিয়ে দিয়েছে যে দেবীর পর সম্ভবত নিশীথিনী নিয়ে তারা হাজির হবেন। হয়তোবা বাংলাদেশের সিনেমার পরিপ্রেক্ষিতে বলার সাহস তারা পাচ্ছেন না। কারন দেবি থেকে সে পরিমান লাভ আসলেই না সেটা করা সম্ভব। আর তেমন যদি হয় তাহলে নিশ্চিত করে বলতে পারি শবনম ফারিয়া তাঁর অভিনয় জাদু দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতে পারবেন। যেমনটি তিনি খুব কম সময়ে দেবী সিনেমাতেই করে দেখিয়েছেন।

মিসির আলি ও চঞ্চল চৌধুরী

দেবী সিনেমায় সব থেকে চাপ ছিলো চঞ্চল চৌধুরীর উপর। কারন মিসির আলি। মিসির আলিকে পাঠক তাদের কল্পনায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভেবেছে তাই ভিন্ন ভিন্ন সেসব কল্পনার সাথে মেলবন্ধন করে একজন চাক্ষুষ মিসির আলিকে পর্দায় নিয়ে আসাটা সত্যিকার অর্থেই খুব কঠিন কাজ বলাই যায়। বয়সের তুলনায় চরিত্রটা একটু কঠিন ছিলো কিন্তু চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় মুগ্ধকর ছিলো। হুমায়ূন আহমেদ ঠিক যে ভাবে চেয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই মিসির আলিকে চঞ্চল চৌধুরি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মিসির আলি এক কথা বার বার বলতেন না, কোনো রহস্যের সমাধানও তিনি সোজা ভাবে বলে দিতেন না ৷ যুক্তি ছাড়া মিসির আলি কিছু বলতেন না। সিনেমায় মিসির আলিকে সে ভাবেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু মিসির আলিকে নিয়ে মানুষের আশা এতই বেশী যে সে তুলনায় তাঁর স্ক্রিনিং কম লেগেছে। পর্দায় মিসির আলিকে আরো বেশীক্ষন দর্শক চেয়েছিলো এবং আরো কার্যক্রম আশা করেছিলো সে তুলনায় মিসির আলিকে পূর্ণ ভাবে পাওয়া যায়নি। আর এখানেই মিসির আলিকে নিয়েই দর্শক একটু কষ্ট পেতেই পারে।

সিনেমেটগ্রাফির কাজ ছিলো অসাধারন, সাথে ছিলো দারুন ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কাজ। থ্রিলারের আলো-আঁধারির ব্যাপারটা ধরে রাখা হয়েছিলো পুরো সিনেমা জুড়ে। ডার্ক থিম এর মুভিগুলোতে এই বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছবিতে একটা গান ব্যাবহার করা হয়েছে তাও সিনেমার দরকারে। অনম বিশ্বাস খুব সুন্দর ভাবে প্যারালালি দুটি গল্প টেনে নিয়ে গেছেন। খটকা লাগেনি। মিস্ট্রি থ্রিলারের যারা ফ্যান, তাদের কাছে দেবী একটা উদাহারন হতেই পারে। আর হ্যাঁ, সবার মত আমিও বলবো “নিশীথিনীর” অপেক্ষায় রইলাম।

– অবয়ব সিদ্দিকী

You may also like...

Leave a Reply