Bangladeshi Featured Reviews Movie Review

মনুষ্যত্বের দহন!

মাস দুয়েক আগের কথা।
ফেসবুকে জুড়ে তখন তীব্র সমালোচনা।
মুভি গ্রুপগুলোয় তো চলছিলই, পার্সোনাল টাইমলাইনেও চলছে একটি বিশেষ লাইন নিয়ে স্ট্যাটাস।
মাতাল হয়ে হিসু করবো দেয়ালে,
যা হবে দেখা যাবে কাল সকালে!
মূলত, তখনই নজর পড়ল মুভিটার দিকে। আমি একজন সাধারণ দর্শক হিসেবেই যদি বলি, গানটা নিয়ে এত আলোচনা দেখতে দেখতে ইউটিউব থেকে আমিও গানের খানিকটা দেখলাম। সিয়ামের একটা গুন্ডা লুক, আর একটু লাফালাফি। সত্যি বলতে, বিন্দুমাত্র আগ্রহ পেলাম না। আরও একটা ওভারহাইপড এক্সপেক্টেশন এর অপমৃতুর অপেক্ষায় তখন আমি।

গত বৃহস্পতিবার তৃতীয়বারের মতো দহন দেখে এসে মনে হলো, কিছু কথা বলার সময় হয়েছে! দহন সিনেমার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়েছিল খুব ধীরে ধীরে। তবে, আগ্রহের চূড়ান্ত রূপ পায় ট্রেইলার রিলিজের পর।
দহন কেন দেখতে যাবো?
অনেকগুলো কারণ আছে।
তবে, প্রথম কারণটাই সিয়াম আহমেদ।
সে কথায় আসছি।

দহন সিনেমার ট্রেইলার মুক্তি পাবার পর থেকেই সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, ট্রেইলারেই গল্পের পুরোটা বলে দেয়া হয়েছে।
কথা কিন্তু ভুল না।
তবুও দহনের সৌন্দর্য কিংবা সার্থকতা এখানেই।
২০১৩ সালের দিকে, সারাদেশে যে অরাজকতা চলছিল, জলের দরে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে একের পর এক প্রাণ! পেট্রল বোমা নামক এক আতঙ্কের সাথে নতুন করে পরিচয় হলো আমাদের!
“আধ বোতল তেল আর একটু আগুন” যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে দুনিয়ার বুকে নরকের অকল্পনীয় বিভীষিকাকে করে তুলতে পারে নির্মম বাস্তবতা, পত্রপত্রিকার লেখালেখি আর টিভি-রেডিওর ব্রেকিং নিউজ থেকে তা উপলব্ধি করার সৌভাগ্যটা (!) হয়তো আমাদের তেমন হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির নিষ্ঠুর বলি হয়ে কত প্রাণ জ্বলে পুঁড়ে ছাই হয়েছে পিচ ঢালা রাস্তায় সে খবরটাও বা রেখেছে কয়জন? একেকটি প্রাণের সাথে সাথে একেকটি পরিবার আর হাজারও স্বপ্নের হয়েছে অপমৃত্যু!


আমাদেরকে সেই “নারকীয় বিভীষিকা ও হাজারও স্বপ্নভাঙন” এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে রায়হান রাফির দহন! মূল গল্পের প্রায় পুরোটাই দেখানো হয়েছে সিনেমার প্রথমার্ধে, নন লিনিয়ার স্টোরি হওয়ায়, শেষ পরিণতিটাও দর্শক অনুমান করতে পেরেছে সহজে। তবুও সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধই একে করে তুলেছে অনন্য।
৬টি ভিন্ন ভিন্ন গল্পকে এক সুঁতোয় গেথে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ৬টি গল্পের পরিণতি শেষে, সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধে দর্শক দেখেছে তুলার পরিণতি।

আমাদের দেশের নোংরা রাজনীতির নিদর্শনে, পয়সা দিয়ে যেমন মানুষকে মিছিলে নেয়া যায়, তেমনি পয়সা দিয়ে সেই মিছিলে বোমাও মারা যায়। কিন্তু যে মানুষগুলো পয়সা নিয়ে নির্দ্বিধায় একটি বোমা ছুঁড়ে চলে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, তারা কি একবারও ভেবে দেখে যে, তাদের হাতে আসা সামান্য কয়টা টাকা করে দিয়েছে কত অপূরণীয় ক্ষতি!? আপনজন হারানোর আগ পর্যন্ত কি তারা কখনও পায় সে যন্ত্রণার স্বাদ?







এমন হাজারও তুলার অন্তর্চক্ষু খুলে দিতেই অসাধারণ দৃশ্যায়নে দহন সিনেমায় দেখানো হয়েছে কীভাবে একজন তুলা নিজ অপরাধবোধে নিজের ভেতর জ্বলে পুঁড়ে ছারখার হয়ে কুঁকড়ে মরে প্রতি মুহূর্তে! শত সমালোচনা শুনেও যারা বিশ্বাস রেখে হলে গেছেন বা যাচ্ছেন সিনেমাটি দেখতে, তাদের জন্য এক বিশেষ উপহার “হে খোদা” গানটি! আপনজন হারানোর যন্ত্রণা আর নিজের মনের কারাগারে বন্দী হয়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করা তুলাকে একই সাথে তুলে ধরা হয়েছে অসাধারণ এই গানটিতে। ট্রেইলার দেখে পুরো গল্প জেনে হয়তো গেছেন আপনি, কিন্তু, সেই পুরো গল্প দেখা শেষেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো সিনেমা দেখে যেতে হবে আপনার। দহনের সার্থকতা এখানেই। তুলার অপরাধবোধ তীব্রভাবে গ্রাস করবে আপনাকে। কাছের মানুষটিকে হারানোর শূন্যতা অনুভব করবেন আপনি। আর মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা নোংরা রাজনীতির প্রতি জন্ম নেবে তীব্র ঘৃণা।




দহন সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন গল্পে প্রায় ৪০টি ক্যারেক্টার কাজ করেছে। একদম ফ্ল-লেস না হলেও, প্রায় প্রত্যেককেই পর্দায় নিজ নিজ চরিত্র ফুঁটিয়ে তোলার ব্যাপারে বেশ আন্তরিক মনে হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য Monira Akter MithuSushama Sarker, শিশুশিল্পী রাইসা এবং Fazlur Rahman Babu। আশার মায়ের চরিত্রে মনিরা মিঠু দূর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এছাড়াও, ডাক্তার আপা চরিত্রে অভিনয় করা সুষমা সরকার একজন মা হয়ে সন্তান হারানোর কান্নার দৃশ্যায়ন ছিল এককথায় প্রাইসলেস! শিশুশিল্পী হিসেবে রাইসাকে কিন্তু বেশ মনে ধরেছে আমার। দহনের পর মোস্তফা কামাল রাজের আপকামিং সিনেমা “যদি একদিন” এ রাইসা অভিনয় করেছে অন্যতম প্রধান একটি চরিত্রে।
“নিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধু রে” গানটা শুনতে শুনতে এ রিভিউ লিখছি। গুণী অভিনেতা ফজলুল রহমান বাবু, অভিনয়গুণে লিডার চরিত্রটাকে একদম নিজের করে নিয়েছেন। স্বাভাবিক স্বর বদলে উৎকট ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠ লিডার চরিত্রটাকেই দর্শকদের সামনে একটু বিদঘুটে ভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। আর এ পরিবর্তনটাই চরিত্রকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। এছাড়াও স্পাই চরিত্রে মিরাক্কেল খ্যাত জামিল, মর্গ প্রশাসক হিসেবে পাঁকানো গোঁফে অপু, ইমাম সাহেব চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ পর্দায় যোগ করেছেন বাড়তি স্বাদ!




সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন Zakia Bari Mamo। সাংবাদিক চরিত্রে মমকে পারফেক্ট মনে হয়েছে। এ ধরনের সাংবাদিক চরিত্রগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিমেল কাস্টিং প্রাধান্য দেয়া হলেও অনেকেই মানিয়ে নিতে পারেন না। কিন্তু, মমকে দেখে “No One Killed Jessica”র রানী মুখার্জীর কথা মনে পড়েছে। ইনফ্যাক্ট, ঢাকা অ্যাটাক সিনেমায় সাংবাদিক চরিত্রে মাহির চেয়েও মমকে অনেক বেশি সাবলীল ও মানানসই লেগেছে।
আশা চরিত্রে অভিনয় করেছেন Pujja Cherry। গার্মেন্টসকর্মী আশা চরিত্রে প্রবেশ করে পর্দায় আনা পূজার জন্য একটু কঠিনই মনে হয়েছে। যদিও অনস্ক্রিন রোমান্সে সিয়াম-পূজাকে আগের চেয়েও অনেক বেশি পরিণত লেগেছে। আশা করি, এই জুটির প্রতি ভবিষ্যতেও দর্শকদের ভালোলাগা অব্যহত থাকবে।




ফাইনালি, Siam Ahmed!
দহন সিনেমা দেখতে আগ্রহী হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ইন্সপিরেশনের নাম সিয়াম। এতগুলো ক্যারেকটারের মাঝে থেকেও সিনেমার সব স্পটলাইট নিজের করে টেনে নিয়েছেন সিয়াম। আমাদের দেশের কমার্শিয়াল ফিল্মগুলোয় অধিকাংশ নায়কের অভিনয় দেখলে এখনও মনে হয় জাস্ট মেকআপ নিয়ে কিংবা আউটফিট চেঞ্জ করে পর্দায় মুখে কয়েকটা ডায়লগ কোনোমতে উচ্চারণ করে দেয়াটাই অভিনয়! কিন্তু চরিত্রের সাথে মিশে গিয়ে, নিজে লিটারেলি সেই চরিত্র হয়ে প্রতিটি মুভমেন্ট, প্রতিটি জেসচার, প্রতিটি অ্যাকশনে সাবলীল হতে পারলে, তারপর আসবে ডায়লগ ডেলিভারি। নয়তো, পুচ্ছ পরালেই কি আর কাক কখনো ময়ূর হয়? পর্দায় তুলা চরিত্রটি দেখে সিয়ামের ডেডিকেশন স্পষ্ট বোঝা গেছে বারবার। এক্সপ্রেশনগুলোও ছিল ঠিকঠাক। দর্শকদের মনে আনন্দ, বেদনা, ক্রোধ, করুণা সবগুলোই জাগিয়েছে তুৃলা চরিত্রটি।


পেট্রলবোমার আগুনে এত এত মানুষের দহন যেমন দেখেছে দর্শক, তেমনি দেখেছে সেই পেট্রলবোমা ছুঁড়ে দেয়া মানুষরূপী জানোয়ারের ভেতরের “মানুষ”টাকে। দেখেছে অনুশোচনা, হতাশা, ক্রোধ, পরাজয়, আর স্বপ্ন ভাঙনে সেই মানুষটার আত্মদহন। দেখেছে, মৃত্যুর আগেই অপরাধবোধে তিল তিল করে মৃত্যু! বস্তিতে ভাঙা গাড়ির ভেতর উল্টে থাকা সিয়াম আর হাজতে বন্দী সিয়াম শুধু কস্টিউমই বদল করেনি, বদল করেছে সত্ত্বা। ফার্স্ট ডে তে শ্যামলী সিনেমা হলে মুভিটি দেখেই ইন্সট্যান্ট ফিডব্যাকে যে কথাটা বলেছিলাম, পরবর্তীতে ব্লকবাস্টার ও বলাকায় আবার দেখেও অপরিবর্তিত রইল সে মত। ২০১৮ সালের শেষ সময়ে এসে সিয়ামের এমন চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স (ওয়ানম্যান শো বা হিরোইজম নয়, অভিনয়শৈলীর জাদু) তাকে করে তুলেছে এ বছরের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারের অন্যতম প্রধান দাবীদার। আসছে বছর মুক্তি পাচ্ছে সিয়াম অভিনীত “ফাগুন হাওয়ায়”। অপেক্ষায় রইলাম।
আশা করি, মুগ্ধ করবেন আবারও।

সিনেমার মেকিং আর ভিএফএক্স নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। লিনিয়ার ভাবে শ্যুট হওয়া মুভিটা যে পরবর্তীতে এডিটিংয়ের সময় নন-লিনিয়ার বানানো হয়েছে, এটা একটু খেয়াল করতেই বোঝা গেছে। সিনেমায় তিনটি ব্যাপার খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে। প্রথমত বিভিন্ন সিন আর সিকোয়েন্সে প্রচুর জোড়াতালি ফুটেজ ছিল। শ্যুটিংয়ে এনজি শট থাকেই। কিন্তু সাধারণত একাধিক ক্যামেরার ব্যবহার করলে ক্যামেরা শিফটিংয়ের মাধ্যমে ক্লিপ গুলো জোড়া লাগানো হয়, এতে দর্শক যখন দেখে, পুরো সিনটাকেই বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা একটি সিন মনে হয়। কিন্তু দহনে বারবার এমন কাট কাট জোড়াতালি খুব চোখে লেগেছে। এছাড়াও, কিছু সিনে লিপসিঙ্কে অদ্ভুত রকমের গড়মিল ছিল। এডিটিংয়ের সময় এসবে আরেকটু মনোযোগ দিলে ভালো হয়। ফোকাসিং নিয়েও যথেষ্ট সমস্যা মনে হলো। মধুমিতা বা অন্যান্য হলগুলোয় হয়তো ব্যাপারটার অত চোখে পড়বে না। কিন্তু, আপনি সিনেপ্লেক্সে দেখেন, ব্লকবাস্টার্সে দেখেন, শ্যামলীতে দেখেন, ব্লারি ভাবটা ধরা পড়বে। আর বোঝার ওপর শাকের আঁটি ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। সিনেমা শুরু হতেই কানে এলো খুবই পরিচিত একটি সুর।
যার নাম Now we are free!


আমার প্রশ্ন হলো এত বাজেটের একটা সিনেমায় কেন বিদেশী চলচ্চিত্র থেকে বিজিএম ধার করতে হবে? তাও আবার GladiatorOnce Upon A Time In The WestSlumdog Millionaire এর মতো বিখ্যাত সব মুভির! একটা সময় ২ ঘন্টার সিনেমায় ৭-৮টা গান যোগ করে রানটাইম তিনঘন্টার বানানো হতো। ওসব দিন প্রায় ফুরোনোর পথে। আগে মানুষ গানের জন্য সিনেমায় গল্প সাজাতো। কিন্তু সিনেমায় গানের কাজ সিনেমার গল্প বলতে সাহায্য করা, বাড়তি গল্প যোগ করা নয়। আর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের ইম্পর্টেন্স অনেক। ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রতিটা টোন, প্রতিটা বিটের আপ-ডাউন প্রতিটা সাউন্ডেরই কোনো না কোনো মিনিং থাকে। ইভেন কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড যদি একদম সাইলেন্টও থাকে, সেটাও কোনো কিছু মিন করে। ঠিকঠাক বিজিএমের ব্যবহার হলে, ডায়লগ শুনে আপনার জানতে হবে না যে, এই সিনে আপনার ভয় পাবার কথা, এই সিনে সিটের এজে চলে আসার কথা, আপনার সাইকোলজি আর অ্যাটেনশন নিয়ে ইচ্ছেমতো ছিনিমিনি খেলার জন্যই ব্যবহার হয় বিজিএম। ডায়লগ বা স্ক্রিনপ্লে বোঝার আগেই শুধুমাত্র বিজিএম দিয়ে আপনার মনে, সিনটার ভাইব তৈরী করে দিতে পারেন পরিচালক। আশা করি, আমাদের নির্মাতারা এসব ব্যাপারে আরেকটু যত্নশীল হবেন। আর এ ব্যাপারগুলোয় যখন আপনারা জোর দিবেন, উঠে আসবে প্রতিভাবান দেশী আর্টিস্ট। এছাড়া সিনেমাতে গানের ঠিকঠাক প্লেসমেন্টও যথেষ্ট ইম্পর্ট্যান্ট। এক্ষেত্রে, “হাজীর বিরিয়ানি” আর “হে খোদা” ছিল পারফেক্ট।

দহন সিনেমায় এতগুলো একসাথে গল্প তুলে ধরতে প্রয়োজন ছিল ফাস্ট স্ক্রিনপ্লে। আর সিনেমা শুরুর ৫ মিনিটের মধ্যেই দারুণভাবে কাজটা করে দিয়েছে “হাজীর বিরিয়ানি”! আর অসাধারণ সুরে বানানো হে খোদা গানটার প্রতিটা কথা দর্শকদের হৃদয়ে জাগিয়েছে শিহরণ। “প্রেমের বাক্স” গানটার অপ্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে, সরিয়ে ফেলাকে সাধুবাদ জানাই।

দহনে ভিএফএক্সের ব্যবহারগুলো যথেষ্ট ভালো ছিল। বাসের ভেতর বিস্ফোরণের সময় ডিটেইলিংয়ের সিনটা কিংবা নিউজ পেপার ফ্ল্যাশের দৃশ্যগুলো সিনেমায় যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। নিউজ ফ্ল্যাশের সিনটা সম্ভবত আমাদের দেশী ফিল্মে দহনেই প্রথম ব্যবহৃত হলো। অনেক কিছুরই সূচনা হয়েছে দহনের হাত ধরে। আর সিনেমায় ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশী দর্শকদের জন্য (বাংলা সিনেমার দর্শক বলবো না, কারণ এই সিনেমা শুধু নিয়মিত বাংলা সিনেমা দর্শকদের জন্যই নয়) দহন ছিল এ বছরের শেষ চমক! বিশেষ এক উপহার। হলে গিয়ে বিদেশী সিনেমা দেখা দর্শকদেরকে আরও একবার হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য দহন টিমকে ধন্যবাদ। পিওর কমার্শিয়াল সিনেমা হিসেবে দহনকে লেটার মার্কস দেয়াই যায়!
বর্ধিত হলসংখ্যা নিয়ে এখন সাফল্যের সাথে দেশব্যাপী চলছে দহন। আর এই সিনেমা দেখে যদি একজন মানুষও সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে আর কখনোই সামান্য কয়টা টাকার বিনিময়ে এভাবে হাজারও স্বপ্ন আর প্রাণ ছিনিয়ে নেবে না, তাহলেই দহনের সার্থকতা!
একক হলগুলোর পাশাপাশি মাল্টিপ্লেক্সগুলোয় দর্শক মাতিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও মুক্তি পেয়েছে দহন।

দর্শকরা দহনকে এত ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন দুইটি কারণে। ভিন্নধর্মী কনসেপ্ট আর রিলেটেবল কন্টেন্ট। এক ঘুষিতে ১০ জনকে ফেলে দেয়া কিংবা বিশাল বিশাল ডায়লগবাজীর ওয়ানম্যান শো এখন সাউথ ইন্ডিয়ান ফিল্মেও কমে এসেছে। বিশাল বাজেটের “থাগস অফ হিন্দুস্তান”কে সরিয়ে দিয়ে, বহু স্ক্রিনে চলতে থাকে “বাধাই হো”, “টুমবাড়”, “আন্ধাধুন” এর মতো মুভি। মানুষ এখন পিওর এন্টারটেইনমেন্ট খুঁজতেও ক্লাস মেইনটেইন করে। আর দর্শকদের জন্য নয়, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেদের জন্যই আগ্রহী হওয়া উচিত নির্মাতাদের।
কারণ, দর্শক হলমুখী হলে বাঁচবে শিল্প।
আর শিল্পই যদি না বাঁচে,
শিল্পী বাঁচবে কীভাবে?
.
এখন যেমন এক বছরে ৪-৫টা বলার মতো সিনেমা হয়, আগে ৪-৫ বছরেও উল্লেখযোগ্য একটা সিনেমা পাওয়া যেত না। কমার্শিয়াল ফিল্মের পাশাপাশি লিটারেচার বেজড “দেবী”র কথাই বলুন কিংবা অফট্র্যাকের “মাটির প্রজার দেশে” বা “পাঠশালা”, এসব সিনেমা মুক্তির সাহস কিন্তু এখন নির্মাতারা করছেন। সামনের বছর আসছে জয়া আহসানের “ফুড়ুৎ”, সিয়ামের “ফাগুন হাওয়ায়”, তাহসানের “যদি একদিন”, বিদ্যা সিনহা সাহার “সাপলুডু” সহ আরও কিছু সিনেমা। ওদিকে জাজ থেকে এলো, ২০১৫ সালে পাইপে আটকে মারা যাওয়া শিশু জিহাদের ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানানোর ঘোষণা। প্রচলিত প্রেম-ভালোবাসার গল্প থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দেশের সিনেমা পিপলরা এখন এক্সপেরিমেন্টাল হচ্ছেন, নতুন নতুন টেস্ট ট্রাই করতে ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছেন, এটা আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক বিশাল ব্যাপার। বাংলাদেশী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য ২০১৮ হয়ে রইল অন্যতম সফল একটি বছর।
পরিবর্তনের পালে লেগেছে হাওয়া।
আর এ ধারা অব্যহত থাকলেই,
ফিরবে বাংলা সিনেমার সুদিন।

==============================
ফুয়াদ আনাস আহমেদ
ডিসেম্বর ৯, ২০১৮

You may also like...

Leave a Reply