Featured Indian TV Show

স্বপ্নের পথে ছুটে চলার বাস্তব লড়াই – কোটা ফ্যাক্টরি!

“ভিক্ষা করতে ভালো লাগে?
ভিক্ষা করা ছেড়ে দাও!
সত্যিই কিছু চাইলে,
পরিশ্রম করো
ছিনিয়ে নাও!”

জগতে প্রত্যেক শিশুই কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, মেধা নিয়ে জন্মায়। ছোটবেলায় এইম ইন লাইফ বা জীবনের লক্ষ্য রচনা তো আমরা সকলেই পড়েছি। ছোট ছোট চোখজোড়ায় তখন খেলা করত কত রঙ, কত স্বপ্ন। কিন্তু, পরীক্ষার খাতায় লেখা সেই স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়ন করার সুযোগ কতটুকু পাই আমরা? স্বপ্নের পথে এগিয়ে কি আদৌ যেতে পারি? করতে পারি সেই মেধা কিংবা প্রতিভার কদর? নাকি বাবা-মায়ের চাপিয়ে দেয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যারিস্টার হবার স্বপ্নের পেছনে মরিচিকার মতো ছুটেই কেটে যায় আমাদের শৈশব-কৈশোর? আবার এই নোংরা প্রতিযোগিতার ঘূর্ণিপাকে পথ হারায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। স্বপ্ন পূরণ করা কি এতই সহজ?

“মা-বাবার সিদ্ধান্তে ভুল হতেই পারে,
কিন্তু নিয়তে কখনোই ভুল থাকতে পারে না।”

উত্তর ভারতে রাজস্থানের এক ছোট্ট শহর ‘কোটা’। চম্বল নদীর পাড়ের এ শহরে প্রায় ১২ লক্ষ লোকের বসবাস। সাদাসিধে জীবনগুলোয় সেখানে লেগেছে ‘সভ্যতা’র ছোঁয়া। আর সেই সভ্যতায় আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার উৎকর্ষে সেখানে গড়ে উঠেছে এক ফ্যাক্টরি!
যার নাম “কোটা ফ্যাক্টরি!”

পুরো কোটা শহরটাই যেন আস্ত এক কোচিং পাড়া।
প্রতি বছর ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আসে কোটায়। তুমুল প্রতিযোগীতা ও শিক্ষার্থীদের চাপ সামলাতে এখানে আছে ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন রকম কোচিং সেন্টার। কিন্তু সেই কোচিং সেন্টারগুলোতে ভর্তি হতে গেলেও, আগে দিতে হয় ভর্তি পরীক্ষা।







আবার কোনো কোচিংয়ে টিকলেই শুধু হবে না। টিকতে হবে প্রথম সারির কোনো ব্যাচে। কারণ এসব ব্যাচে টিচারদের মনোযোগ সাপোর্ট ও কোয়ালিটিও হয় প্রথম সারির। হাই স্কুল তো কোনোমতে বাচ্চাদের 11th ও 12th Grade পাশ করিয়ে বের করতে পারলে বাঁচে। ফলে, ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিটা স্কুল থেকে কখনোই পুরোপুরি নেয়া সম্ভব হয় না। আর তাই, 10th Grade শেষ করেই এখানে চলে আসে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। প্রস্তুতি নিতে হবে। যেভাবেই হোক টিকতে হবে IIT তে। “টিকতে না পারলে, আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে” মনভাব নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে সবাই।




শুরু হয় যুদ্ধ!
এ এক অন্যরকম যুদ্ধ!
যুদ্ধ শেষে বিজয়ীদের কীর্তিগাথা ও জয়ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে কোটাসহ সারা ভারতে। আর হার মানা যোদ্ধারা, নীরবে ছাড়ে কোটা। বছর ঘুরে কোটার বুকে আবারও আছড়ে পড়ে নতুন শিক্ষার্থীদের স্রোত। এভাবেই চলছে অদ্ভুত এই “কোটা ফ্যাক্টরি”!




সেই স্রোতে ভেসেই একদিন, IIT তে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে মধ্য প্রদেশ থেকে কোটায় আসে ‘বৈভব পান্ডে’। বয়স তার মাত্র ১৬। নিজ স্কুলে টপার হলেও, কোটায় এসে সে বুঝতে পারে বাস্তবতা। এখানে প্রায় সবাইই তার মতোই নিজ নিজ স্কুলের টপার। আর তাই, লড়াইটা এবার তার আরো বড়।




এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত কোচিং মহেশ্বরী।
আর তাই মহেশ্বরী চান্স পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্য সহায় হয়নি বৈভবের। বাবার সাথে বহু ঘোরাঘুরির পর, প্রডিজি কোচিংয়ে শেষ দিকের একটি ব্যাচে জায়গা হয় তার। হোস্টেলে উঠে বৈভবের পরিচয় হয় কোটার লবণাক্ত পানি ও ভিন্ন এক পরিবেশের সাথে। শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়। অ্যাডমিশনের প্রস্তুতি নেয়ার চেয়েও, বাবা-মা কে ছেড়ে নতুন এ পরিবেশে খাপ খাওয়ানোই আগে হয়ে যায় তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আর সেই চ্যালেঞ্জে তাকে পথ দেখাতে এগিয়ে আসে মিনা ও উদয়। নতুন এক পরিবার পায় বৈভব। সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে তার জন্য ছুটে ফেরে দুজন! আর বিপদে আপদে জিতু ভাইয়া তো আছেই।

সবার প্রিয় “জিতু ভাইয়া” একজন IIT গ্রাজুয়েট, যার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিটাও হয়েছিল এই কোটা থেকেই। ঘড়ি ধরে ইন্টারন্যাশনাল ফিজিক্স অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সলভ করা তার জন্য ডালভাত ব্যাপার। ইন্ডিয়ার সব ফিজিক্স টিচার নিজেদের বইয়ের সলভ করার জন্যও নিশ্চিন্তে হাজির হয় জিতু ভাইয়ার কাছে। আর এখন তিনি কোটায় ফিজিক্সের নম্বর ওয়ান টিচার।

বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন করতে ভালোবাসা বৈভবের বিভিন্ন দ্বিধা জর্জড়িত প্রশ্নের উত্তর যখন আর থাকে না আর কারো কাছে, এগিয়ে আসে জিতু ভাইয়া। যে কোনো সময় যে কোনো সমস্যার সমাধান কিংবা পরামর্শ পাওয়া যায় একমাত্র জিতু ভাইয়ার কাছে। হোক সে সমস্যা অ্যাকাডেমিক, নন অ্যাকাডেমিক, পার্সোনাল, ফাইন্যান্সিয়াল, রোমান্টিক, সবকিছুর সমাধান আছে জিতু ভাইয়ার কাছে।

বর্তমানের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে আমাদের ভবিষ্যত। লোকে বলে, কৈশোরের আবেগের জোর নাকি সহস্র মনের চেয়েও বেশি। আর তাই কৈশোরে নেয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের গুরুত্ব যেন আরো বেশি, এ টিনএজ সময়টাতে রক্তে থাকে আবেগী উষ্ণতার দোলাচল। আর তাই, এ সময়র ভুল সিদ্ধান্ত যেমন গড়ে দিতে পারে গৌরবের ভবিষ্যত, তেমনি চুরমার করতে পারে, হাজারো স্বপ্ন।

নিজেদের ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া বাবা-মায়ের অতিপ্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে নাজুক দশায় পড়া হাজারো শিক্ষার্থী প্রতি বছর এই ইদুর দৌড়ে সামিল হয়, শুধুমাত্র রিকগনিশনের আশায়। পাশাপাশি মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্ন রূপ নেয় বাস্তবে। কিন্তু, সেই স্বপ্ন পূরণের রাস্তাটা মোটেই মসৃণ নয়। সবকিছু ছাপিয়ে, কৈশোরে সহজেই প্রলুব্ধ করার মতো হাজারও ইচ্ছে ও আবেগ এড়িয়ে, ক্যারিয়ার ও নিজেকে গড়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিচালক কোটার দিনগুলোর পজিটিভ দিক তুলে আনার চেষ্টা করলেও, “কোটা ফ্যাক্টরি” শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করা এক কিশোরের গল্পই নয়। শিক্ষালাভের চেয়ে রিকগনিশনের ঝোঁকে ছুটে চলা, কোচিং ব্যবসার কূটনীতি ও অর্থের বিনিময়ে তাদের মেধা চুরির খেলা, পাশাপাশি কৈশোরের আবেগ কাটিয়ে স্বপ্নের পথে অবিচল থাকার প্রত্যয়, সবই ফুঁটে উঠেছে এই ৫ পর্বের এই মিনি সিরিজে। ৭৭৫৭টি ভোটে এখন পর্যন্ত আইএমডিবিতে 9.7/10 রেটিং পেয়েছে টিভিএফের নতুন এই ওয়েব সিরিজ।

যারা এখনো টিভিএফের নাম শোনেননি, তাদেরকে একটু পরিচয় করিয়ে দেয়া যাক।
তরুণসমাজের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে দারুণ সব কনটেন্ট পৌঁছে দিতে, ২০১০ সালে The Viral Fever (TVF) নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়। একের পর এক কনটেন্টের জোরে এখন পর্যন্ত তাদের ইউটিউব সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা প্রায় ৬ মিলিয়ন! Permanent Roommates, Yeh Meri Family, Pithers, Fathers সহ বহু দর্শক সমাদিত ওয়েব সিরিজ উপহার দিয়েছে টিভিএফ ব্যানার।
এছাড়া তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপ সার্ভিসও আছে।

“ইয়ে মেরি ফ্যামিলি” খ্যাত সৌরভ খান্না নির্মিত ও রাঘব সুব্বু পরিচালিত “Kota Factory”, টিভিএফের অরিজিনাল কনটেন্ট লাইব্রেরির এক নতুন সংযোজন। যার প্রধান প্রধান চরিত্রে আছে মায়ুর মোরে (বৈভব পান্ডে), রঞ্জন রাজ (বালমুকুন্দ মিনা), আলম খান (উদয় গুপ্তা)। এছাড়াও, জিতু ভাইয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন, টিভিএফের পরিচিত মুখ, পিচার্স, ট্রিপলিং ও ব্যাচেলর্স খ্যাত জিতেন্দ্র কুমার। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন IIT গ্রাজুয়েট।

বিখ্যাত সিনেমা শিন্ডলার্স লিস্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পর্দায় কোটা শিক্ষার্থীদের বিষণ্ন-বিবর্ণ জীবন ফুটিয়ে তুলতে ডিওপি জেরিন পল পুরো সিরিজ সাদা-কালোয় চিত্রায়ন করলেও, চিত্রনাট্যে বর্ণের কোনো কমতি ছিল না। ক্যামেরার কাজ ভালো ছিল। আর ড্রোন শটগুলোতে স্ক্রিনপ্লে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

টিভিএফ বরাবরই তাদের শোগুলোয় মিউজিক নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু, কোটা ফ্যাক্টরির বিজিএম ও সাউন্ডট্র্যাক যেন সে চেষ্টাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। সুর ও অনুভূতির মিশেলে পর্দায় গল্পছবি এগিয়েছে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো আপন গতিতে!

Inventory, Assembly Line, Optimization, Shutdown ও Overhaul
নামের ৫টি এপিসোডেই কোটা ফ্যাক্টরি সিজন ১ শেষ হলেও, গল্প কিন্তু শেষ হয়নি। ইতিমধ্যেই টুইটারে সিজন ২ আসার ইঙ্গিতও দিয়েছে টিভিএফ। স্ক্রিপ্টের পেছনেও যে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। টিভিএফের প্রতিষ্ঠাতা একজন IIT গ্রাজুয়েট। এই শোয়ের ডিরেক্টরিয়াল টিমেও আছে IITian দের আধিক্য। তাই, রিলেটিভ এলিমেন্টের উপস্থাপনগুলো হয়েছে অসাধারণ। সায়েন্স রিলেটেড ডায়লগ হোক কিংবা মোটিভেশনাল অথবা হিউমারাস, কমতি ছিল না কোনো কিছুরই।

পর্দায় বৈভব-মিনা, দুই কিশোরের কেমিস্ট্রি এবং সিরিজ জুড়ে বিভিন্ন ফান এলিমেন্ট ও টেস্টের ভ্যারিয়েশনে এক মুহূর্তের জন্যও বোরিং লাগেনি প্রায় ২০০ মিনিটের এই মিনি সিরিজ। লিড ক্যারেক্টার বৈভব চরিত্রে মায়ুরের অভিনয় ছিল দেখার মতো। আর জিতু ভাইয়ার ডায়লগ ও এক্সপ্রেশনেও সহজেই “ভরসার বড়ভাই” এর সেই জায়গাটা খুঁজে পাওয়া গেছে। তাছাড়া আমাদের দেশের আন্ডারগ্র্যাড অ্যাডমিশন টেস্টের জন্য যাদের কোচিং করার অভিজ্ঞতা আছে, তারা এই সিরিজের সাথে দারুণভাবে নিজেদেরকে কানেক্ট করতে পারবেন।

👆👆👆 যারা এখনো দেখেননি, দেখে ফেলতে পারেন সহজেই। 👆👆👆

হাতে কয়েকঘন্টা সময় থাকলে, বিঞ্জওয়াচে রেকমেন্ড করার মতো পারফেক্ট শো ‘কোটা ফ্যাক্টরি’। পার্সোনাল রেটিং: ৪/৫

– – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – –

ফুয়াদ আনাস আহমেদ
মে ১৮, ২০১৮

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *