Bangladeshi Featured Reviews Movie Review

আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত ও পাঠশালা!

মীনা, মনের কথা, ঠাকুরমার ঝুলি, নন্টে ফন্টে, টম অ্যান্ড জেরি, পোকেমন, ক্যাপ্টেন প্লানেট, সামুরাই এক্স, উডি উড পেকার এসব ছিল ৯০’র শিশুদের শৈশব। পরবর্তীতে এলো সিসিমপুর, জোছনার ফুল, মজার মজার গল্পসহ আরও অনেক কিছু। মীনার সাথে হেসে খেলে সামাজিক সমস্যা যেমন বুঝতে শিখেছি, ঠাকুরমার ঝুলি থেকে রকমারি গল্পের বৈচিত্র্য, নন্টে ফন্টের হাস্যরস, টম অ্যান্ড জেরির আদি অকৃত্রিম দুষ্টুমি, আরও কত কী!!
আধা ঘন্টা বা এক ঘন্টার শো দেখেই কিন্তু শেষ না। কল্পনার রাজ্যে ছিল আমাদের অবাধ বিচরণ! সে দুনিয়ার হাজারও রঙয়ে রঙতুলিটাকে আমরা করে দিতাম মুক্ত! এমন হাজারও স্বপ্নে আর গল্পে তিল তিল করে গড়া আমাদের শৈশবে ছিল কল্পনাময় বাস্তবতায় নিজেকে মেলে ধরার প্রয়াস। ছিল কল্পনার সবটুকু রঙ ঢেলে বাস্তবতাকে রাঙিয়ে তোলার প্রয়াস। গল্পের বই ছিল আমাদের কল্পনার আরও এক ভালোবাসার নাম।
কিন্তু আলাদিনের গালিচার মতো ঘড়ির কাঁটা আর ক্যালেন্ডারের পাতায় চেপে সময় গেছে অচিন কোনো ভুবনে!
হারিয়ে গেছে সময়!
হারিয়ে গেছে ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো!
পাল্টে গেছে বিনোদনের মাত্রা।
প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই সময়ে, শিশুদের সঙ্গী আজ স্মার্টফোন। শৈশবের যে সময়টায় আমরা “বাবা, গল্পের বইটা আর একটু পড়েই লাইট অফ করে দিবো” বলেছি, সে সময়টায় তারা “বাবা, গেমের এই লেভেলটা শেষ করেই ফোন রেখে দিবো” নিয়ে ব্যস্ত।
কোথায় যেন কেটে গেছে সুর।
নেই আর সেই মিষ্টতা।
স্বপ্ন বোনার রঙিন সুঁতোর খোঁজে আর যায় না আমাদের শিশুরা। অনেক বাবা মা-ই সন্তানের জন্য সুস্থ শিশুতোষ বিনোদন, শিক্ষামূলক বিনোদনের খোরাক যোগানোয় উদাসীন।
কিন্তু, মনে রাখবেন, শিশুদের মন কাদামাটির মতোই। কুমোর যেমন একদলা মাটিকে নিজের মনের মাধুরি আর সৃজনশীলতা মিশিয়ে করে তোলে অপরূপ। তেমনি আপনার শিশুর মননশীলতাকে আপনি এখনই লেখাপড়ার ইদুর দৌড় আর হাতের মুঠোফোনে বন্দী করে তুলবেন কিনা, সে সিদ্ধান্তটাও নিতে হবে আপনাকেই!
.
সুস্থ শিশুতোষ বিনোদন বলতে আমি কী বোঝাতে চাইছি, তা একটু খোলাসা করি।
একটা শিশুর কল্পনার বিস্তৃতি অসীম!
আমরা বিশ্বাস করি প্রতিটি শিশুই প্রতিভাবান।
কিন্তু আমরা সে প্রতিভার খোঁজটুকু কি তাকে পেতে দেই?
যে বিনোদনের মধ্য দিয়ে একটা শিশু নিজেকে চিনতে পারে, নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে চিনতে পারে, তাকেই আমি বলি সুস্থ শিশুতোষ বিনোদন। যে বিনোদন শিশুর আবেগ নিয়ে খেলা করার পাশাপাশি তাকে নীরবে দিয়ে যাবে কোনো শিক্ষা, তাকেই আমি বলি শিক্ষামূলক বিনোদন। নিজেদের অজান্তেই তাদের স্বপ্নগুলো যে ক্রমশ বন্দি হয়ে যাচ্ছে, এ দায় কাদের?
প্রতিটি সন্তানের অভিভাবকের!
স্কুলে একটা শিশু কেন যাবে?
একটা শিশু স্কুলে খেলার রাজ্য ভেবে।
যেখানে থাকবে তার খেলার সাথীরা!
কিন্তু আমরা আমাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাচ্ছি হাজারও বইপুস্তক আর মার্কশিটের আমলনামার জন্য! আর দিনভর স্কুল, রাতভর কোচিং শেষে যখন বাচ্চাটা বাসায় ফেরে, হয় দেখে টিভিতে বড়দের অনুষ্ঠান অথবা ফোনে বড়দের বিনোদন।
ভাবছেন, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শিশুদের স্বপ্ন কেন বন্দি হচ্ছে না?
আসলে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শিশুরা আমাদের শিশুদের চেয়েও আরও ভালো স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তি পাচ্ছে। তাহলে তাদের শিশুরা কেন আমাদের শিশুদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে না?
প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থা আর শিক্ষার গুণগতমানে তাদের সাথে আমাদের রয়েছে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
দ্বিতীয়ত, সুস্থ শিশুতোষ বিনোদনের ব্যবস্থা তারা করছে প্রতিনিয়তই। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তারা ঘুরতে যায়, একসাথে দেখে শিশুতোষ চলচ্চিত্র! কিন্তু আসল টুইস্টটা এখানেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষ শুধু মাত্র ওদের স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটই দেয়নি। দিয়েছে অ্যানিমেশন মুভির ট্রেন্ড যা একই সাথে ওদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও রাখে বিশাল অবদান! বক্স অফিস গুলোতেও অ্যানিমেশন মুভিগুলোর জয়জয়কার!
চলতি ৫ বছরের বিবেচনায়, আমাদের প্রিয় ওয়েবসাইট আইএমডিবির তথ্যানুসারে ২০১৪ সালে ২৪৩টি অ্যাানিমেশন মুভি মুক্তি পেয়েছিল। যে সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে চলতি বছর (২০১৮) এ এসে সো ফার অ্যানিমেশন মুভি মুক্তি পেয়েছে ৪৪৭টি! আর মাঝের তিন বছরে ২০১৫ সালে ২৭৬টি, ২০১৬ সালে ২৯১টি ও ২০১৭ সালে ৪০৮টি। এদের সবগুলো যদিও শিশুতোষ নয়। সংখ্যাটা অর্ধেক হলেও কিন্তু নয়। আর সেখানে বাংলাদেশে এই পাঁচ বছরে শিশুদের জন্য ৫টা মুভিও কি হয়েছে?
ছুটির দিনে তারা সপরিবারে সবাই এসব মুভি উপভোগ করেন। ইন দ্য মিন টাইম, আমরা আমাদের শিশুদের দেখাই শুধু “বড়দের প্রেম ভালোবাসা”! ভায়োলেন্স দেখাই, জটিলতা আর নিষ্ঠুরতা দেখাই। ধ্বংসাত্মক জগতে বেড়ে ওঠা শিশুটি কি সৃজনশীল সৃষ্টিসুখে উল্লাসে মেতে ওঠার তৃপ্তি পাবে কখনও?

ছোটবেলায় দেখা সিনেমা “দীপু নাম্বার টু” এর কথা মনে পড়ে? কিংবা একটু বড়বেলায় দেখা, “আমার বন্ধু রাশেদ”?
সাম্প্রতিক সময়ের এমন চার পাঁচটা মুভির নাম বলতে পারবেন? পারার কথাও না। কারণ, আমাদের দেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র তৈরির ধারাটা বেশ পেছনেই পড়ে আছে। অ্যানিমেশন মুভি বানানোর মতো সামর্থ্য বা ইন্ডাস্ট্রি এখনও আমাদের নেই বললেই চলে। এসবে ভরসা করতে হয় বাইরের ইন্ডাস্ট্রির ওপর। কিন্তু, আমরা অ্যানিমেশন মুভিও বানাবো না, আবার শিশুতোষ চলচ্চিত্রও বানাবো না, তাহলে সিনেমা থেকে আমাদের শিশুরা শিখবে কী? বই আর সিনেমা কোনটা থেকে বেশি শেখা যায়, এ তর্ক বেশ পুরনো। কিন্তু সিনেমা তো আমাদের কিছু একটা শিক্ষা দেয়? সে সিনেমাগুলো যদি তৈরিই হয় বড়দের জন্য, তাহলে সেখান থেকে শিশুদের প্রাপ্তি কতটুকু? পরিচালক সিনেমায় হরেক রকম মেসেজ দেন। অনেক সময় সামাজিক সমস্যাকে রুখে দাঁড়াতে ২ ঘন্টার একটা মুভি হাজারও ক্যাম্পেইনের চেয়েও ভালো কাজ করে। তাহলে, বড়দের জন্য যদি থাকে এত এত মেসেজ, শিশুরা যে নিয়মিত স্কুলে যাবে, লেখাপড়া করবে, জ্ঞান অর্জন করবে, একে অপরকে সম্মান-ভালোবাসা (নট বড়দের প্রেম ভালোবাসা) দিতে শিখবে, একে অন্যকে সাহায্য করবে, অন্যায়কে রুখে দাঁড়াবে, ন্যায়ের পথে থাকবে, এই মেসেজগুলো শিশুরা পাবে কোত্থেকে?
কোন বড়দের মুভি ওদেরকে এই শিক্ষাগুলো দিবে?
পরিবারের ব্যস্ত মানুষগুলো সপ্তাহের ছুটির দিনটায় একসাথে শিশুতোষ মুভি দেখতে গেলে শিশুটি কি শুধু সিনেমা থেকেই শিখবে? ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে, পরিবারের সবাই মিলে ভালো একটা সময় কাটানোর সুখটাও তো তাদের প্রাপ্য!
সবকিছুর বিবেচনায়ও, শিশুদের জন্য কাজ করায় খুব বেশি দেরি কিন্তু হয়ে যায়নি। প্রায় ৩-৪ বছর আটকে থেকে, অবশেষ এ বছর মুক্তি পেল পাঠশালা। প্রতিবছরই দুই তিনটে করে শিশুতোষ মুভি হওয়া উচিত এবং বাবা মায়েরও উচিত তাদের সন্তানকে মুভিগুলো দেখানো! এভাবেই আমাদের দেশেও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে গড়ে উঠতে পারে, সুস্থ শিশুতোষ বিনোদনের ট্রেন্ড! আর এ বিনোদনের ধারাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে শিশুদের অভিভাবকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। পাঠশালা মুভিটি মুক্তির তারিখ বারবার পিছিয়েছে। কেন জানেন? কোনো হলই পাওয়া যায়নি বলে।
বিশ্বাস করুন, জঘন্য সব সিনেমা আমাদের হলগুলোতে দিনের পর দিন চলে। অথচ আমরা এসব ভালো ভালো মুভি হলে পাই না। কেন জানেন? “এসব শিশুতোষ মুভির দর্শক কম। মাইনষে খালি মারামারি কাটাকাটি আর রোমান্স খোঁজে” এভাবেই বলেন হল মালিকেরা। অবশেষে মুক্তি পেয়েছে দুই মাল্টিপ্লেক্স যমুনার Blockbuster Cinemas ও বসুন্ধরার STAR Cineplex এ। আমরা যদি এসব মুভি দেখতেই না যাই, তাহলে বানানো হবে কাদের জন্য? দর্শক না থাকলে মুভি থাকবে কী করে? এই মুভিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বটা আমাদেরই। ছোটদেরকে ছোটদের ফিল্ম দেখার সুযোগ করে দেয়ার দায়িত্বটা আমাদেরই!
.
.
ভালো সিনেমার সংজ্ঞা কী?
মুভির জনরা অনেক। কোনো আদর্শ সংজ্ঞার আলোকে ফেলে কাঁটাছেঁড়া করে মুভির বিশ্লেষণ হয়তো করাই যায়। কিন্তু একজন সাধারণ দর্শকের জন্য উপভোগ্য যে কোনো সিনেমাই ভালো সিনেমা।
একটা সিনেমা দেখার পর যদি দর্শকের মনে পরিচালকের দেয়া মেসেজটা গেঁথে যায়, তবেই পরিচালককে সার্থক বলা যায়! প্রত্যেক পরিচালকই একজন গল্পকথক। যে গল্পটা তিনি বলতে চান, সেটাকেই দুই-আড়াই-তিন ঘন্টায় তিনি পর্দায় ফুঁটিয়ে তোলেন। আর এই গল্প বলার ছলে তিনি দর্শকের আবেগ নিয়ে খেলা করেন। আর দর্শকও নিজ আবেগকে পরিচালকের হাতে সঁপে দিয়ে ডুব দেয় গল্পে!
.
পাঠশালা নতুন আঙ্গিকে সাজানো খুবই সাধারণ এক সিনেমা। ইনসেপশনের মতো জটিল কঠিন সিনেমা নয় পাঠশালা! একদম সহজ সরল ভাষায় সাবলীল ভাবে দুই পরিচালক Faisal Roddy ও Asif Islam বলে গেছেন ছোট্ট মানিকের গল্প। গ্রাম থেকে জীবিকার টানে শহরে আসা মানিকের শেখার অদম্য ইচ্ছা শক্তির মুখোমুখি হয় শত শত বাধা! সাবলীল স্ক্রিনপ্লে জলের মতো এগিয়ে নিয়ে গেছে গল্পটিকে, যাতে একে একে যুক্ত হয়েছে কালু, চুমকি, দপ্তরী চাচাসহ আরও অনেকেই। তবুও গল্পটা তো মানিকের। লেখাপড়াকে মন থেকে ভালোবাসা মানিক তাই ঢাকার এক ওয়ার্কশপে কাজ নিলেও হাল ছাড়ে না। স্বপ্ন দেখে আবারও স্কুলে ফিরে যাবার। লেখাপড়ার রাজ্যে ফিরে যাবার।
মানিক কি পারবে স্কুলে ফিরে যেতে?
শুধু পাঠশালার মানিক নয়,
সব মানিকের জন্য স্কুল চাই!
.
.
স্বল্প বাজেটের এই মুভিকে এর সিনেম্যাটোগ্রাফি আর বিজিএম করে তুলেছে আরও উপভোগ্য। ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর অভিনয়ও ছিল দূর্দান্ত। আবার বাচ্চাদের দুষ্টুমি আর ছেলেমানুষি মাখা ডায়লগ শুনে সিনেমা হলে বড়রাও খিলখিল করে হেসেছে ছোটদের সাথে পাল্লা দিয়ে। পথশিশু মানিক কোনো সুপারহিরো নয়, কিন্তু স্বপ্ন ভাঙা কালুর মতো হার মানতে নারাজ মানিক ঠিকই জয় করে নিতে এগিয়ে চলে তার স্বপ্নের পথে। এজন্যই আপনার শিশুকে পাঠশালা দেখান, পরিচয় করিয়ে দিন মানিকের সাথে। আর এমন হাজারও মানিক ছড়িয়ে আছে আমাদেরই আশেপাশে। মজার ব্যাপার হলো, এই মুভিটি থেকে আয়ের টাকায় তৈরি হবে মানিকদের জন্য স্কুল।
আর তাই, পথশিশুদের পাশে থাকুন।
পাশে থাকুন পাঠশালার!
আপনাদের অনুপ্রেরণাতেই তৈরি হবে এমন হাজারও পাঠশালা। আর আপনার শিশু পাবে সুস্থ শিশুতোষ বিনোদনের উৎস! পথশিশুদের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসবো আমরা সবাই!
আর সমস্বরে বলবো,
সব মানিকের জন্য স্কুল চাই!

============================

ফুয়াদ আনাস আহমেদ
ডিসেম্বর ৪, ২০১৮

You may also like...

Leave a Reply