Foreign Movie Review

Valerie and Her Week Of Wonders (1970)- দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিবরতনের এক স্বপ্নিল যাত্রা !

Valerie And Her Week Of Wonders (1970)- চেকোস্লোভাকিয়া

– টিন-ড্রামা/সুরিয়াল- হরর।

 

– বিশাল বাগানের মাঝের ওই ছোট্ট কুঠিতে, ১৩ বছরের এক কিশোরী নিশ্ছিদ্র নীরবতায় ঘুমোচ্ছে। ছাদ বেয়ে সন্তর্পণে কেউ একজন তার কক্ষটিতে প্রবেশ করলো। ঘুমন্ত কিশোরীর কানের দুল জোড়া খুলে নিয়েই ছাদ বেয়ে নেমে ছুট লাগালো লোকটি। কিশোরীর ঘুম ততক্ষণে কেটে গেছে। মুহূর্ত খানেকে পরিস্থিতি বুঝে উঠে দুলজোড়া উদ্ধারে লোকটির পিছুপিছু দৌড়ুতে লাগলো সে। দৌড়ুতে গিয়েই নেউলের মুখোশ পড়া বীভৎস এক লোকের মুখোমুখি হলো কিশোরী। এবং সে-মুহূর্ত থেকেই অবিরত ভবে অস্বাভাবিক ঘটনাবলীর সামনাসামনি হতে লাগলো সে। স্বপ্নবৎ অবস্থায় রয়েছে যেন কিশোরী’টি। (অসংখ্য রূপক দৃশ্যে ভারী এই সিনেমার প্রারম্ভিক এই দৃশ্যটি, হিসেবে সেসব রূপকের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র ।)

অদ্ভুতুড়ে সেই লোক।

জ্যারোমিল জায়ার্স/অ্যারোমিল ইয়েরেস (Jaromil Jires) এর ” ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স ” সিনেমা’টিকে শব্দ এবং ইমেজের প্রাচুর্যতায় পরিপূর্ণ এক ভান্ডার হিসেবে অভিহিত করা যায়। গল্প বর্ণনার চেনা ঢঙে এই সিনেমার গল্পকে ঠিক বয়ান করা সম্ভব নয়। আকৃতি অনুসারে এ গল্প কিছুটা সংকীর্ণ এবং প্রকৃতিগত দিক থেকে পুরোপুরি দ্ব্যর্থবোধক। হতে পারে, উপন্যাসের প্রতি সৎ থেকেই এই সিনেম্যাটিক সংযোজন’টি ওমন দ্ব্যর্থবোধকতায় অটল থেকেছে। সহজ ভাষায় গল্পটিকে সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়- ১৩ বছরের কিশোরী ভালেরি, সে থাকে তার এক বয়স্কা খালার সাথে। (সময় এবং তাদের চারপাশ সম্পর্কে কোন ধারণা জন্ম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না।) হঠাৎ ভালেরির খালা নিরুদ্দেশ হয়ে যায় এবং যুবতী হয়ে ফিরে আসে। সিনেমা এগিয়ে চলার সাথে সাথে খালার সাথে ভালেরির সম্পর্ক এবং তার বাবা-মা সম্পর্কে জানতে পারা যায়। বহুউপায়ে ব্যাখ্যার উপযুক্ত এই গল্পকে ধরা যায়, ভালেরির বাবা-মা’কে খুঁজে বেড়ানোর জার্নি হিসেবে। তবে গল্পের মূল কেন্দ্রের জায়গায়, তা একটি অংশ হয়ে থাকবে বড়জোর। ভালেরির রোজকার জীবন নানা কল্পচিত্রতে সাজানো। সরলতায় ঘন কল্পচিত্র। কিন্তু ভালেরির চারপাশটা বদলে যায়, প্রথমবারের মত ‘মাসিক’ এর অভিজ্ঞতা যখন তার হয়। এবং এখানটাতেই গল্পের মূল শেকড় বিস্তৃত। প্রথমবার মাসিক হওয়ার পর থেকে ভালেরি নতুন এক কাঁচে দেখতে শুরু করে তার পৃথিবীটাকে, যে কাঁচ যৌনতার ভুলভাল ব্যাখ্যা আর অদ্ভুতুড়ে চরিত্রদের আনাগোনায় হয়ে উঠে অস্বচ্ছ। এবং ভালেরি যতই তার নতুন কাঁচের কল্পপৃথিবীর গভীরে যেতে শুরু করে, ততই দুঃসাধ্য হয়ে উঠে বাস্তব আর তার কল্পজগতকে আলাদা করা।

 

পরিচালক এরোমিল ইয়েরেস, ষাটের দশকের চেক নব-তরঙ্গের সিনেমার পরিচালকদের একজন। তবে ‘ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স’ পুরোপুরিভাবে চেক নব-তরঙ্গের সিনেমা নয়। কারণ, মোটাদাগে সে-ন্যারেটিভে এই সিনেমা এগোয় নি। শুধু তাই-ই নয়, এরোমিল ইয়েরেসের নিজস্ব বৃত্তের ও বাইরের কাজ এটি। ‘ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স’ স্বকীয় ধারা মেনে চলেছে। যৌনাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে প্রথমবার বুঝতে পারার জটিলতাকে অসংখ্য রূপক দ্বারা এবং দৃশ্যগত ও ভাবগত দিক থেকে ফ্রয়েডিয়ান ড্রিমস্কেইপের সূক্ষ্ম ছায়ায় অনন্য এক ন্যারেটিভের সংযোজন ঘটিয়েছে এই সিনেমা।







ফ্রয়েডিয়ান মেটাফোর।

” আমি ঘুমিয়ে আছি এবং এ সবকিছুই আমার কল্পনা “- সিনেমা আরম্ভের কিছু সময় পর মূল চরিত্র ভালেরির এই সংলাপ জানান দেয় ঘোরলাগা বাস্তবের এবং এ ও নিশ্চিত করে যা কিছু ঘটতে চলেছে পর্দায়, তা ঘটবে এই কিশোরির অবচেতনে। কিন্তু যা ঘটছে তা এতই সারল্যমাখা যে, বাস্তব বৈ অন্য কিছু খেয়ালে আসে না। ভালেরি এই ঘোরলাগা বাস্তবের মুখোমুখি কি তার দিবাস্বপ্নে হচ্ছে, নাকি দুঃস্বপ্নে, নাকি দুটোই- সে প্রশ্ন প্রথম উত্থিত হয় তার মাসিকের পর থেকে। ভালেরির প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতাকে রূপকের ব্যবহারে বোঝাতে, দেখানো হয়- বেলী ফুলের মাথায় এক ফোঁটা রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। (এ গোটা দৃশ্যটি ভর করেছে অবিস্মরণীয় এক কাব্যিক মূর্ছনায়।) ভালেরির প্রথম মাসিকের পরপরই গল্পের গতিপথ বদলে ধাবিত হয় ভ্যাম্পায়ার, কালো জাদু, অসৎ পাদ্রী, ডাইনী শিকারের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপিয়ান লোককাহিনী ও ঐতিহাসিক মূল্য বহন করা ঘটনাবলীর দিকে। ভালেরির সদ্য নারীত্বে পদার্পণকে নাটকীয় করে তুলতেই এই বিষয়গুলোর সন্নিবেশ ঘটানো হয়। এবং সিনেমার নামে উল্লেখিত, ” সপ্তাহ ” দিয়ে নারীত্বের ব্রত গ্রহণের পরের স্বপ্নিল সময়টাকে নির্দেশ করা হচ্ছে।




ভালেরির স্বপ্নিল যাত্রার একটি ক্ষুদ্র দৃশ্য।

সিনেমার মূল ন্যারেটিভে; বিভিন্ন অদ্ভুতুড়ে চরিত্র দিয়ে ভালেরির যৌন প্রতিবোধ ঘটানো এবং খুব সরলভাবে বিভিন্ন মানুষের প্রেমে পড়ে যাওয়ার এই গোটা বিষয়টি, ভালেরির সাবালিকা হয়ে উঠার পর্যায়টিকে উপস্থান করে। মুক্তচিন্তার জাগরণ আর প্রথাগত বিশ্বাসের মাঝে ভাগ হয়ে যায় যেন ভালেরি। এই বিভক্তি শুধু ভালেরির পূর্ব সত্ত্বা আর নতুন বোধের সঞ্চারণ ঘটা সত্ত্বার মাঝেই নয় বরং তার সমবয়সী ছোকরা ইগলেট (যার উপস্থিতি শুধুমাত্র সিম্বলিক ন্যারেটিভে) আর ভ্যাম্পায়ার আকৃতির সেই মানুষটির মাঝেও (মূল ন্যারেটিভে; ভালেরির পরিবর্তন ও তাকে অন্ধকারের মুখোমুখি করার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে যে।)।

এবং এখান থেকেই ” ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স ” হয়ে যায় দ্বৈততার সিনেমা। সরলতা এবং যৌনতা, বিশ্বাস এবং স্বাধীনতা, ভয় এবং আনন্দের মাঝে সেতু স্থাপন করার একটি নিবন্ধ হিসেবে উল্লেখ করা যায় এই সিনেমাকে।

অর্থ এবং আকৃতির এই দ্বৈততা অর্জন করতে ইয়েরেস এই সিনেমার নন্দনতত্ত্বে অনেককিছুর সমাহার করেছেন। প্রলেপিত দৃশ্যকলা আর লুবোস ফিসারের সঙ্গীত দিয়ে, দৃশ্য আর সঙ্গীতের চেনা সম্পর্কে বৈপরীত্য এনেছেন ইয়েরেস। নেউলের মুখোশ পরিহিত অদ্ভুতুড়ে মানুষটি যেসব দৃশ্যে উপস্থিত ছিলেন সেসব দৃশ্যে, এই ‘সঙ্গীত আর দৃশ্যের সংঘর্ষ’ আরো বেশি পরিষ্কার হয়ে উঠে। এসব দৃশ্যে অনেকটা লালাবাই ধরনের ব্যবহৃত সঙ্গীত অদ্ভুতুড়ে চরিত্রের এবং সিনেমার প্রকৃতির, স্বভাববিরুদ্ধ (অন্ধকার কিছু যে ভালেরিকে সবসময় ছেয়ে থাকবে, সেটিকে নির্দেশ করতে সঙ্গীত দিয়ে দৃশ্যগুলোর মেজাজে বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছেন ইয়েরেস)। সিনেমার আবহগত জটিলতায় সঙ্গীত আরো দ্ব্যর্থবোধকতা রচনা করছে- প্রথমদিকে এমন মনে হলেও, লুবোস ফিসারের আবহসঙ্গীত এই অসংখ্য দৃশ্যাবলিতে অন্যরকম এক মায়াময়তার-ও সৃষ্টি করে। আর এই মায়াময়তা-ই শেষ অব্দি ভালেরির যৌবনপ্রাপ্তিকে জটিল গোলকধাঁধায় নিক্ষেপ করে।




‘দৃশ্যগত জটিলতা’ ছেয়ে থাকা একটি ক্ষুদ্র দৃশ্য।

‘ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স’ এর গ্রামটি স্থান নিয়েছে ছেলেবেলার রূপকথার গল্পের সেসব গ্রামে। একইসাথে মধ্যযুগীয় এবং উনিশ শতকের গোড়ার দিককার গ্রাম্য পরিবেশের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় এতে। ভালেরির সারল্যকে ফুটিয়ে তুলতে সিনেমায় ‘মিজ-অঁ-সেন’-এর ব্যবহার করেছেন ইয়েরেস। ‘মিজ-অঁ-সেন’- এর চমৎকার ব্যবহার সিনেমার প্রারম্ভিক দৃশ্যেই পাওয়া যায়। ভালেরির গায়ের জামা হতে শুরু করে রুমের রঙ, বিছানার রঙ সবকিছুতেই সাদাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বাঁশির মধুর সুরে ভালেরির সরলতা আরো বেশি দৃষ্টিগোচর হয়ে উঠে দৃশ্যটিতে। এই টেকনিক আরো অনেক সিনেমাতেই লক্ষণীয় কিন্তু এই দৃশ্য, সাবটেক্সটে- সিনেমায় আসন্ন নিগূঢ়তার যে আভাস দেয় এবং তাতে গোটা দৃশ্যে যে আবহের তৈরি হয় তা ‘ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স’ এর জটিল প্রকৃতিকে আরো খোলসমুক্ত করে। সিনেমার অধিকাংশ শট অবশ্য ভালেরির গৌজি ক্লোজ-আপে নেওয়া হয়েছে। এবং ক্লোজ-আপ শটগুলোতে ভালেরির অভিব্যক্তি, সিনেমার বাস্তব আর কল্পনার মাঝের সূক্ষ্ম ফারাক’কে আরো অস্পষ্ট করে তুলেছে। ভালেরির চলন-বলনে নমনীয়তা এতখানি, তাকে দেখা যেতে পারে ১৩ বছর বয়সী যে কোন সাধারণ মেয়ের জায়গায়। রূপকথার গল্পের রাজকুমারীদের সহজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ভালেরির সারল্যে হয়ে উঠেছে যেকোনো ১৩ বছরের কিশোরীর চেনা অবচেতন। এবং বিবরণসমৃদ্ধ ওয়াইড শটগুলো তার চরিত্রটিকে আরো বেশি সার্বজনীন হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

 

বিশ্বাস এবং বাস্তবের বিপরীতমুখী অভিপ্রায়ের উপস্থাপন, ‘ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স’-এর সবচেয়ে কঠিন সিনেম্যাটিক অ্যাসপেক্ট। তবে ধর্মতত্ত্বের বিশ্বাস নয় বরং প্রধান চরিত্রের নৈতিক বিশ্বাসের জায়গাটিই সিনেমার গোটা ন্যারেটিভ গঠন করে এবং এই চরিত্রের কল্পনাবিলাসই ন্যারেটিভে বিচ্ছিন্নতা এনেছে মাঝেমধ্যে। ভালেরির সদ্য আবিষ্কৃত যৌনকামনা কোন অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নিবৃত- এমন’টি দেখাতে ধর্মের প্রসঙ্গ গুরুত্ববহ হয়ে উঠে সিনেমায় এবং সিনেমার দৃশ্যকল্প আর সঙ্গীতেও তার আভাস পাওয়া যায়। সিনেমার ভিজ্যুয়াল প্যালেটের মতোই, আবহসঙ্গীত ধর্মান্ধদের প্রশ্নের সম্মুখীন করার পাশাপাশি, স্বীয় বক্তব্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এবং সিনেমার শেষ দৃশ্য ধর্ম বিশ্বাস ও ভালেরি চরিত্রের যৌনকামনা- দুইয়ের মাঝে যোগ আনে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গীতে।




শেষের অদ্ভুত রিচুয়াল দৃশ্য।

” ভালেরি এন্ড হার উইক অফ ওয়ান্ডার্স “-কে বিশেষিত করা যায়, ‘শারীরিক এবং মানসিক বিবর্তনের এক স্বপ্নিল যাত্রা’ বলে। ইয়েরেসের পরিচালনা এবং ন্যারেটিভ এই যাত্রার অস্থিমজ্জা হলেও, যাত্রার পূর্ণতৃপ্তি এনে দেয় ফিসারের আবহসঙ্গীত। ভালেরির জটিলতাগুলো যেমন সার্বজনীন, তেমনি এর ফলাফল ও অনিবার্য।

 

ভালেরির প্রথম মাসিকের পর্বকে ভিজ্যুয়ালি তুলে ধরতে দারুণ সিম্বলিক একটি পোস্টার।

You may also like...

Leave a Reply